
মোঃ শামীউল আলীম শাওন
সকালের রাজশাহীতে সাহেববাজারের ভিড় ঠেলে এগোতে গেলে একটি রূঢ় সত্য খুব নগ্নভাবে চোখে পড়ে। সেটি কোনো পরিসংখ্যান নয়, বরং একজন নাগরিকের নিরুপায় হয়ে ফুটপাত ছেড়ে পিচঢালা মূল সড়কে নেমে আসা। তার সামনে বাস, পেছনে হর্নের আর্তনাদ, চারপাশে তীব্র তাড়াহুড়া—আর মাঝখানে এক ধরণের নীরব আত্মসমর্পণ। যেন এই প্রিয় শহর তাকে প্রতিনিয়ত বলছে, “এই ফুটপাতটুকু তোমার নয়; এখানে তুমি অনাহুত।” এই দৃশ্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের নগর জীবনের এক কদর্য ও নিয়মিত উপাখ্যান।
এখানেই বড় প্রশ্নটি ওঠে—শহর আসলে কার? নাগরিকের, নাকি দখলদারের?
সম্প্রতি একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (আরসিসি) দখল হয়ে থাকা ফুটপাতগুলোর স্রেফ জায়গাভিত্তিক বাজারমূল্য প্রায় ১,২৩০ কোটি টাকা। এই বিশাল অংকটা কোনো ব্যাংকে জমা নেই; এটি মূলত এক বিশাল সরকারি সম্পদ যা বর্তমানে এক শ্রেণির দখলদার আর ‘লাইন-ম্যান’দের পকেটে বন্দি। সংখ্যাটি একটি কঠিন আর্থিক অনুবাদ মাত্র, যা নির্দেশ করে যে—নগরের এই বিপুল 'পাবলিক স্পেস' আজ সাধারণ পথচারীর নাগালের বাইরে।
আমরা সাধারণত ফুটপাতে হকার বসাকে স্রেফ গরিব মানুষের রুটি-রুজি হিসেবে দেখে এক ধরণের মানবিক প্রশ্রয় দিতে পছন্দ করি। কিন্তু এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক সুসংগঠিত এবং অন্ধকার অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামো। আন্তর্জাতিক নগর গবেষক অনন্যা রায়ের ‘আর্বান ইনফরমালিটি’ তত্ত্ব এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি দেখিয়েছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা আসলে রাষ্ট্রের স্রেফ অপারগতা নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা একটি লাভজনক ব্যবস্থা।
রাজশাহীর সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর বা রেলগেট এলাকায় একজন হকার যখন ফুটপাতে বসেন, তিনি রাষ্ট্রকে কোনো কর দেন না ঠিকই, কিন্তু এক অদৃশ্য ‘লাইন-ম্যান’কে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৫০০ টাকা ‘টোল’ দিতে বাধ্য হন। এই বিপুল অবৈধ অর্থের ভাগ স্থানীয় প্রভাবশালী থেকে শুরু করে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে যায়। ফলে উচ্ছেদ অভিযানের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ফুটপাত আবার পুরনো চেহারায় ফিরে আসে। এই চক্রটি এতটাই শক্তিশালী যে, এখানে নাগরিকের হাঁটার অধিকার আর সিন্ডিকেটের পকেট—এই দুইয়ের লড়াইয়ে বারবার নাগরিকই পরাজিত হয়।
আন্তর্জাতিক নগর বিশ্লেষক ডেভিড হার্ভে তার ‘রাইট টু দ্য সিটি’ তত্ত্বে একটি সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আধুনিক শহরগুলো ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করা হবে। রাজশাহীর ফুটপাত আজ হার্ভের সেই আশঙ্কারই জীবন্ত দলিল।
অথচ আইনি দিক থেকে আমাদের সুরক্ষা কিন্তু যথেষ্ঠ মজবুত। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। সুপ্রিম কোর্টও বিভিন্ন সময়ে স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছে যে, জনসাধারণের চলাফেরার পথ অবাধ রাখা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। সিটি করপোরেশন আইন ২০০৯ অনুযায়ী, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা মেয়রের আইনি বাধ্যবাধকতা। তবুও যখন জনপদে ফুটপাত উধাও হয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্র সেখানে তার নিয়ন্ত্রক সত্তা হারিয়ে ফেলেছে। এটি কেবল নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন নয়, এটি সরাসরি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-১১)—‘টেকসই নগর ও জনপদ’ গড়ার অঙ্গীকারের সাথে সাংঘর্ষিক।
তাহলে কি কোনো সমাধান নেই? উত্তর হলো, বুলডোজার চালিয়ে এই কাঠামোগত সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের দরকার বাস্তবসম্মত ‘পলিসি ইঞ্জিনিয়ারিং’। সিঙ্গাপুর বা সিউলের মতো শহরগুলো আমাদের পথ দেখাতে পারে। সিঙ্গাপুরে স্ট্রিট ভেন্ডিং নিষিদ্ধ করা হয়নি; বরং পরিকল্পিত ‘হকার সেন্টার’-এর মাধ্যমে জীবিকা ও জনস্বার্থের ভারসাম্য আনা হয়েছে।
আমাদের এখানেও হকারদের শত্রু না ভেবে তাদের নিয়মের শিকলে বাঁধতে হবে। নির্দিষ্ট ‘ভেন্ডিং জোন’ এবং ফুটপাতে ‘রেড লাইন’ টেনে দিতে হবে যার বাইরে কোনো দোকান যাবে না। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি সিটি করপোরেশন যদি হকারদের থেকে ফি গ্রহণ করে, তবে ‘লাইন-ম্যান’ বা চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাবে। এতে করপোরেশনের রাজস্ব বাড়বে, হকারদের চাঁদাবাজির হাত থেকে মুক্তি মিলবে এবং ফুটপাতে শৃঙ্খলা ফিরবে।
রাজশাহী নিজেকে ‘ক্লিন সিটি’ হিসেবে গর্ব করে। কিন্তু যে শহরের ১,২৩০ কোটি টাকার ফুটপাত অবৈধ দখলে থাকে, সেই শহরের সৌন্দর্য স্রেফ একটি প্রসাধনী লেপন মাত্র। উন্নয়ন কেবল বড় বড় দালান বা চওড়া রাস্তায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না; উন্নয়নের প্রকৃত সুফল পৌঁছাতে হয় সাধারণ নাগরিকের পায়ের নিচের ফুটপাত পর্যন্ত।
দিনের শেষে প্রশ্নটি থেকেই যায়—আমরা উন্নয়নের যে আখ্যান রচনা করছি, সেখানে কি সাধারণ মানুষের নিরাপদে হাঁটার জায়গা আছে? যদি একজন মানুষকে প্রতিদিন নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হয়, তবে সেই উন্নয়ন স্রেফ অসম্পূর্ণ নয়, বরং বৈষম্যের এক নতুন বিজ্ঞাপন।
- লেখক, উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী। প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি: ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ (ইয়্যাস), রাজশাহী।
সম্পাদক: ও প্রকাশক : মোঃ সাকিবুল ইসলাম স্বাধীন।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
ডিএম ভবন(৪র্থ তলা), অলকার মোড়,বোয়ালিয়া ,রাজশাহী
ফোন নাম্বার- 01717-725868
ইমেইল: sokalerbulletin@gmail.com
www.sokalerbulletin.com