নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজশাহী শহর খুব বড় না হলেও এর খোলামেলা পরিবেশ, তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক সড়ক যোগাযোগ, সবুজ প্রকৃতি ও নির্মল বাতাস নগরবাসীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষের কাছেও আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। পড়াশোনা, চাকরি কিংবা বিভিন্ন কাজে রাজশাহীতে এসে অনেকেই শহরটির পরিবেশের প্রেমে পড়ে যান। রাজধানী ঢাকার দীর্ঘ যানজট ও ব্যস্ততার বিপরীতে রাজশাহীর তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ অনেকের কাছেই পছন্দের।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে রেলগেট, বন্ধগেট, বহরমপুরসহ কয়েকটি এলাকায় সড়ক ও ফ্লাইওভারের কাজ চলায় সাময়িক যানজট দেখা দিচ্ছে। এর বাইরে রাজশাহী নগর ভবন থেকে মিয়াপাড়া পুলিশ ফাঁড়ি পর্যন্ত সড়কের একটি অংশেও প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে যানজট তৈরি হচ্ছে। আশপাশে স্কুল, কলেজ, কোচিং ও প্রাইভেট পড়ার প্রতিষ্ঠান থাকায় এলাকাটি অনেকটা ‘বিদ্যাপাড়া’ হিসেবেই পরিচিত।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্লাস শুরু ও ছুটির সময়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক-কর্মচারীদের উপস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই সড়কে চাপ বাড়ে। এর সঙ্গে ফুটপাত ও ড্রেনের ওপর একের পর এক দোকান, ফুডকার্ট ও ভ্যান বসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
কোথাও ফুটপাতের ওপর চেয়ার-টেবিল পেতে ক্রেতাদের বসিয়ে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছিল। ফলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হতো। এতে যানবাহনের চলাচলের জায়গা আরও সংকুচিত হয়ে যানজট সৃষ্টি হতো।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর কয়েকটি দোকানে সরকারি বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে অনুমোদনহীনভাবে সংযোগ নিয়ে আলো জ্বালানো এবং উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে ব্যবসা পরিচালনার প্রবণতাও দেখা যায়। একজনকে দেখে অন্যরাও একইভাবে ব্যবসা পরিচালনা শুরু করায় ধীরে ধীরে ফুটপাত দখলের পরিমাণ বাড়তে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ফুটপাত দখলমুক্ত ও অনুমোদনহীন বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। বুধবার (৭ অক্টোবর) মহিলা কলেজ রোডে পরিচালিত অভিযানে বিভিন্ন দোকান ও ফুডকার্ট উচ্ছেদের পাশাপাশি অনুমোদনহীন বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।
অভিযানের পর শুধু উচ্ছেদ করেই থেমে থাকেনি সিটি করপোরেশন। পুনরায় যাতে ফুটপাত দখল করে দোকান বা ফুডকার্ট বসানো না যায়, সে জন্য ফুটপাতের পাশে রেলিং বসানোর কাজও শুরু হয়েছে। এতে পথচারীদের চলাচলের জায়গা উন্মুক্ত রাখার পাশাপাশি নতুন করে দখল ঠেকানো সম্ভব হবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
পথচারী আনন্দ বলেন, খুবই দরকার ছিল এমন একটি উদ্যোগ। এজন্য প্রশাসককে আন্তরিক ধন্যবাদ। আশা করি এবার, অবৈধ রিকশার পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শহরে এসে ভাড়া মারে—এমন রিকশাগুলোর বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে শহরের যানজট ও বিশৃঙ্খলা অনেকটাই কমবে।”
স্থানীয় বাসিন্দা স্বপন বলেন, “নিজের বাপ-দাদার সম্পত্তি না হলে বিক্রি করে অন্য এলাকায় চলে যেতাম। সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা-৯টা পর্যন্ত জ্যামের কারণে পা পুড়ে যায়, হর্নের শব্দে বিরক্তি ধরে যায়। কাজকর্ম শেষ করে একটু ঘুমাব, সেটাও শান্তিমতো পাওয়া যায় না। দখল আস্তে আস্তে বাড়তে বাড়তে এমন অবস্থা হয়েছিল।”
মহিলা কলেজের সামনের এক দোকানি বিশ্ব বলেন, কলেজের ছাত্রীদের কথা মাথায় রেখেই তিনি দোকানটি নিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য, “একটা একটা ক্লাস শেষ হলে মেয়েরা প্রয়োজনীয় জিনিস, মুখরোচক খাবার, কোল্ড ড্রিংকস কিংবা আইসক্রিম নিয়ে দ্রুত ক্লাসে ফিরে যেত। কিন্তু রাস্তার এমন অবস্থা হয়েছিল যে, এই ছোট রাস্তা পার হতে ৪-৫ মিনিট লেগে যেত। যানজটের কারণে ছাত্রীরাও সহজে কলেজ থেকে বের হতে পারত না। ফলে আমাদের দোকানের মূল ক্রেতাও কমে গিয়েছিল।”
তবে অভিযানের পরের চিত্রে স্বস্তি ফিরেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করার উদ্যোগকে ঘিরে শুধু ঘটনাস্থলের বাসিন্দাদের মধ্যেই নয়, রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। রাজশাহীর বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ ও ব্যক্তিগত পোস্টে অনেকে নিজেদের সন্তুষ্টি ও মতামত প্রকাশ করছেন। কেউ দখলমুক্ত ফুটপাতের ছবি দিয়ে সিটি করপোরেশনকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন, কেউ দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কথা তুলে ধরে উদ্যোগটির প্রশংসা করছেন। আবার কেউ নগরীর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফুটপাতেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা জানাচ্ছেন।
নগরবাসীর এসব প্রতিক্রিয়ায় একটি বিষয় স্পষ্ট—শহরের রাস্তা ও ফুটপাত সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখার উদ্যোগটি অনেকের কাছেই স্বস্তির বার্তা হয়ে এসেছে।
তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত থাকবে এবং দখলমুক্ত ফুটপাত ভবিষ্যতে আবার যেন দখল হয়ে না যায়, সে বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ একদিনের উচ্ছেদে নয়, নিয়মিত তদারকি ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই রাজশাহীর পরিচিত স্বস্তিদায়ক পরিবেশ ও যান চলাচল ধরে রাখা সম্ভব।
সম্পাদক: ও প্রকাশক : মোঃ সাকিবুল ইসলাম স্বাধীন।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
ডিএম ভবন(৪র্থ তলা), অলকার মোড়,বোয়ালিয়া ,রাজশাহী
ফোন নাম্বার- 01717-725868
ইমেইল: sokalerbulletin@gmail.com
www.sokalerbulletin.com