
রাজশাহীর পদ্মা-তীরবর্তী শহর দীর্ঘদিন ধরে তার সাংস্কৃতিক শান্তি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য পরিচিত। কিন্তু এই পরিচিত বাস্তবতার নিচে ধীরে ধীরে একটি নতুন ধরনের নিরাপত্তা সংকট গড়ে উঠছে—অদৃশ্য, নীরব এবং প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা। এটি আর কেবল রাস্তার অপরাধ নয়; এটি প্রবেশ করেছে ব্যক্তিগত যোগাযোগের সবচেয়ে গোপন স্তরে—ডিজিটাল ইনবক্সে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং মোবাইল স্ক্রিনের ভেতরে।
এই পরিবর্তনকে আন্তর্জাতিক অপরাধ গবেষণায় চিহ্নিত করা হয় Technology-Facilitated Gender-Based Violence (TFGBV) হিসেবে (UN Women, 2021; UNFPA, 2022)। এটি এমন একটি সহিংসতার রূপ, যা অনলাইনে শুরু হলেও বাস্তব জীবনে গভীর সামাজিক, মানসিক এবং শারীরিক প্রভাব সৃষ্টি করে।
স্থানীয় সংগঠন LOFS-এর ২০২২–২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ভুক্তভোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও অপরাধের প্রকৃতি ক্রমশ জটিল ও সহিংস হয়ে উঠছে। ২০২৪ সালে যেখানে ধর্ষণের ঘটনা ছিল ১৫টি, ২০২৫ সালে তা দ্বিগুণ হয়ে ৩২-এ পৌঁছায়।
এই পরিবর্তন কেবল পরিসংখ্যানগত নয়—এটি আচরণগত অপরাধবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যদি হুমকি, ব্ল্যাকমেইল এবং হয়রানি কার্যত শাস্তিহীন থাকে, তবে তা বাস্তব জগতের সহিংসতার জন্য “risk-free training environment” তৈরি করে।
বাংলাদেশ পুলিশের Cyber Support for Women (PCSW) ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, সাইবার সহিংসতার একটি বড় অংশ ইনবক্স-ভিত্তিক হুমকি, মানহানিকর কনটেন্ট এবং ব্ল্যাকমেইলিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি এখন আর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়—বরং একটি কাঠামোগত ডিজিটাল নিরাপত্তা সংকট।
অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচারহীনতা অপরাধের অন্যতম শক্তিশালী উদ্দীপক। যখন অপরাধী দেখে যে তার কর্মকাণ্ডের কোনো বাস্তব পরিণতি নেই, তখন তার মধ্যে “impunity effect” তৈরি হয়—যা ভবিষ্যৎ অপরাধের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
এই বাস্তবতা ব্যাখ্যা করা যায় Albert Bandura-এর Social Learning Theory দিয়ে। অপরাধী কেবল নিজে শেখে না; সে দেখে, অনুকরণ করে এবং ফলাফল বিশ্লেষণ করে আচরণ গড়ে তোলে। শাস্তির অনুপস্থিতি অপরাধকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য আচরণে পরিণত করতে পারে।
একইভাবে Broken Windows Theory (Wilson & Kelling, 1982) অনুযায়ী, ছোট অপরাধ বা উপেক্ষিত অনিয়ম ধীরে ধীরে বড় অপরাধের ভিত্তি তৈরি করে। ইনবক্স হ্যারাসমেন্ট বা ডিজিটাল হুমকিকে “তুচ্ছ” হিসেবে দেখার প্রবণতা বাস্তবে একটি বিপজ্জনক অপরাধ চক্র তৈরি করছে।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো নাগরিকের সমান আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করে। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে একটি সুস্পষ্ট “justice gap” বিদ্যমান।
ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, আইনি সহায়তা নিতে গিয়ে তারা প্রায়শই সামাজিক চাপ, প্রক্রিয়াগত বিলম্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাসের মুখোমুখি হন। এই অভিজ্ঞতাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতে বলা হয় secondary victimization (UNODC, 2015)—যেখানে ভুক্তভোগী অপরাধের পর বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমেও পুনরায় ক্ষতিগ্রস্ত হন।
ফলে বিচারব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে সুরক্ষার পরিবর্তে একটি পুনঃট্রমার (re-traumatization) কাঠামোতে পরিণত হয়।
LOFS-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮৮ শতাংশ ক্ষেত্রে অপরাধী ভুক্তভোগীর পরিচিত। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতা—যাকে বলা যায় “proximity-based violence structure”।
এই বিষয়টি মনোবিজ্ঞানী Judith Herman তার Trauma and Recovery তত্ত্বে ব্যাখ্যা করেছেন “betrayal trauma” হিসেবে। পরিচিত ব্যক্তির দ্বারা সংঘটিত সহিংসতা কেবল শারীরিক নয়, বরং আস্থা, সম্পর্ক এবং সামাজিক নিরাপত্তার ভিত্তিকেও ধ্বংস করে দেয়।
রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল (গোদাগাড়ী, তানোর, পুঠিয়া) এই সংকটকে আরও তীব্রভাবে উপস্থাপন করে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অর্থনৈতিক চাপ, গ্রামীণ দারিদ্র্য এবং সামাজিক অনিশ্চয়তা পরিবারগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যার মধ্যে বাল্যবিবাহ অন্যতম।
একই সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার ঘটলেও নিরাপদ ব্যবহার ও ডিজিটাল সাক্ষরতা (digital literacy) পিছিয়ে রয়েছে। এই বৈপরীত্যকে UN Women “Shadow Pandemic” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে—যেখানে সহিংসতা মূল সংকটের আড়ালে নীরবে বিস্তার লাভ করে।
এই সংকট মোকাবিলায় খণ্ডিত পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার।
প্রথমত, বিচার ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত বাধ্যতামূলক হবে।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ করতে হবে। প্রমাণ সংগ্রহে বিলম্ব মানে বিচার ব্যর্থতা—এই বাস্তবতা এখন অপরিহার্যভাবে স্বীকার করতে হবে।
তৃতীয়ত, একটি কার্যকর Witness Protection Framework প্রণয়ন করতে হবে, যা ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের আইনি, সামাজিক এবং মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
রাজশাহীর এই পরিবর্তন কেবল অপরাধ বৃদ্ধির গল্প নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং সামাজিক ন্যায়ের একটি বাস্তব পরীক্ষা।
যখন সহিংসতা ইনবক্সে স্থান নেয়, তখন তা অদৃশ্য থাকে, কিন্তু তার প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে বিস্তৃত হয়। বিচার যদি কার্যকর না হয়, তবে তা কেবল বিলম্বিত ন্যায়বিচার নয়—বরং ন্যায়বিচারের অস্বীকৃতি।
রাজশাহী এখন একটি নীতিগত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। প্রশ্নটি স্পষ্ট—রাষ্ট্র কি এই ডিজিটাল সহিংসতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম, নাকি এটি ধীরে ধীরে নতুন সামাজিক স্বাভাবিকতায় পরিণত হচ্ছে?
উত্তরটি নীতিতে নয়—উত্তরটি বাস্তব প্রয়োগে। এখনই।
[caption id="attachment_6206" align="alignleft" width="150"]
Md. Shamiul Alim Shawon[/caption]
সম্পাদক: ও প্রকাশক : মোঃ সাকিবুল ইসলাম স্বাধীন।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
ডিএম ভবন(৪র্থ তলা), অলকার মোড়,বোয়ালিয়া ,রাজশাহী
ফোন নাম্বার- 01717-725868
ইমেইল: sokalerbulletin@gmail.com
www.sokalerbulletin.com