নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণার পরও রাজশাহীতে বাস্তবতা যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে। একদিকে তীব্র তাপদাহে অতিষ্ঠ নগরবাসী, অন্যদিকে একের পর এক কৃষিজমি ধ্বংস, পুকুর খননের নামে মাটি বাণিজ্য এবং বিদ্যমান জলাশয় ভরাটের অভিযোগ ক্রমেই বেড়েই চলেছে। স্থানীয়দের দাবি, অতীতে যে অনিয়ম শুরু হয়েছিল, তা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বন্ধ হয়নি; বরং ভিন্ন পরিচয়ে একইভাবে অব্যাহত রয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় নগরীর ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের দাইরা পার্ক মোড়ে শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) গভীর রাতে একটি পুকুর ভরাটের অভিযোগে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। রাত আনুমানিক ১২টা ৩০ মিনিটে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে দেখা যায়, সুপরিকল্পিতভাবে পুকুর ভরাটের কাজ চলছে। ট্রাক ও ট্রাক্টরের মাধ্যমে বালু এনে পুকুরে ফেলা হচ্ছে এবং একটি এক্সকাভেটর দিয়ে দ্রুত বালু সমান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পাইপের মাধ্যমে পানি ছিটিয়ে বালু বসানোর কাজও চলছিল, যা দেখে স্পষ্ট হয় এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং পূর্বপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত একটি কার্যক্রম।
ঘটনাস্থলে থাকা শ্রমিকদের সাথে কথা বললে তারা জানান, তারা কন্ট্রাক্টের ভিত্তিতে কাজ করছেন এবং “রানা ভাই” নামের এক ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে এই কাজ পরিচালিত হচ্ছে। তারা দাবি করেন, জমির মালিকানা বা প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে তারা কিছু জানেন না, শুধু কাজের দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই পুকুর ভরাট কার্যক্রমের পেছনে মতিহার থানা বিএনপির সভাপতি বাবু , যুবদল কর্মী ‘পাখি’ এবং ২৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতির সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। এছাড়া চন্ডীমা থানার এক বিএনপির প্রভাবশালী নেতার সহযোগিতায় থানা ‘ম্যানেজ’ করেই এই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার সময় চন্ডীমা থানার একটি নীল রঙের পুলিশের গাড়ি ঘটনাস্থলের কাছেই অবস্থান করতে দেখা যায়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেই বালুবাহী ট্রাক অবাধে প্রবেশ করে পুকুরে বালু ফেলতে থাকে। উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বিষয়টি জানানো হলে তারা কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে গাড়ির গ্লাস বন্ধ করে সেখান থেকে চলে যান বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পরবর্তীতে থানায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই গাড়িটি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুল ইসলাম ব্যবহার করেন। গাড়ির চালকের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে ওসি নিজেও উপস্থিত ছিলেন। এতে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—প্রশাসনের উপস্থিতিতেই যদি এ ধরনের কার্যক্রম চলতে পারে, তাহলে আইন প্রয়োগ কোথায়? থানা ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ কি তবে ভিত্তিহীন নয়?
অভিযোগের বিষয়ে মতিহার থানা বিএনপির সভাপতি বাবুর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজে ঘটনাস্থলে না থাকায় যুবদল কর্মী ‘পাখি’র নাম্বার এসএমএস করে তার সাথে কথা বলতে বলেন। পরে ‘পাখি’ দাবি করেন, “ওটা কোনো পুকুর নয়, কাগজে জলাশয় হিসেবে উল্লেখ নেই, তাই ভরাট করলে সমস্যা নেই।” তবে কাগজপত্র দেখানোর কথা বললেও পরবর্তীতে তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।
এদিকে বিষয়টি জানাতে বোয়ালিয়া জোনের সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি, ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি জানার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আইনগত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।” রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক নিলুফা ইয়াছমিন জানিয়েছেন, বিস্তারিত তথ্য পেলে জেলা অফিসকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।
উল্লেখ্য, একই দিন সকালে নগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে “নদী বাঁচাও, পরিবেশ বাঁচাও” স্লোগানে আয়োজিত মানববন্ধনেও দাইরা পার্কের এই পুকুর ভরাটের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়। পরিবেশবাদীরা অবিলম্বে পুকুর ভরাট বন্ধ, পুনঃখনন এবং অতীতে ভরাট হওয়া সব জলাশয় পুনরুদ্ধারের দাবি জানান। তারা গাছ ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরীর জলাশয়গুলো শুধু পানি ধারণের জন্য নয়, বরং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বজায় রাখা এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব পুকুর একের পর এক ভরাট হয়ে গেলে রাজশাহীর পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে।
একদিকে সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি, অন্যদিকে প্রশাসনের উপস্থিতিতেই পুকুর ভরাটের মতো ঘটনা—সব মিলিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে, রাজশাহীর পরিবেশ রক্ষায় বাস্তবে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখা হচ্ছে, আর এভাবে চলতে থাকলে নগরীর অবশিষ্ট জলাশয়গুলো আদৌ টিকে থাকবে কিনা।
সম্পাদক: ও প্রকাশক : মোঃ সাকিবুল ইসলাম স্বাধীন।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
ডিএম ভবন(৪র্থ তলা), অলকার মোড়,বোয়ালিয়া ,রাজশাহী
ফোন নাম্বার- 01717-725868
ইমেইল: sokalerbulletin@gmail.com
www.sokalerbulletin.com