নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজশাহীর আষাঢ় মানেই রথযাত্রা, আর রথযাত্রা মানেই ঐতিহ্যবাহী সাগরপাড়া রথ মেলা। শত বছরের ইতিহাস বহনকারী এই মেলাকে ঘিরে প্রতিবছরই উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে পুরো নগরজুড়ে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এটি এখন রাজশাহীর অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু এবারের রথ মেলা শুরু হওয়ার আগেই সামনে এসেছে উদ্বেগজনক এক বাস্তবতা—চাঁদাবাজি ও অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ।
ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি এটি এখন রাজশাহীর অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক আয়োজনে পরিণত হয়েছে। মেলাকে ঘিরে রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা আসেন। মাটির তৈজসপত্র, বাঁশ ও কাঠের তৈরি সামগ্রী, খেলনা, অলংকার, গৃহস্থালি পণ্য, হস্তশিল্প ও পোশাকের দোকানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। শিশুদের জন্য নাগরদোলা, বিভিন্ন রাইড ও বিনোদনের ব্যবস্থা থাকে। এছাড়া রসগোল্লা, কালোজাম, ছানার মিষ্টি, জিলাপি, পাপড়, ঝুড়ি চানাচুরসহ নানা মুখরোচক খাবারের দোকান মেলায় আগত দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ।
প্রতিবছর কয়েকশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীর আয়ের বড় উৎস হয়ে ওঠে এই মেলা। কিন্তু আনন্দ ও বাণিজ্যের এই আয়োজন ঘিরেই এবার শুরু হওয়ার আগে চাঁদাবাজির অভিযোগ।
রথ মেলাকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা রাজশাহীতে আসতে শুরু করেছেন। মেলার পরিবেশ ও দোকান বসানোর স্থান পরিদর্শনে এসে অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, মেলা শুরু হওয়ার আগেই একটি প্রভাবশালী চক্র ফুটপাত ও নির্ধারিত স্থানগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
সরেজমিনে স্বচ্ছ টাওয়ারের মোড় থেকে সাগরপাড়া পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, ফুটপাত ও রাস্তার পাশে বিভিন্ন স্থানে রং দিয়ে চিহ্ন আঁকা হয়েছে। কোথাও নামের পরিবর্তে কোড, কোথাও আবার রহস্যজনক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব চিহ্ন মূলত দোকানের স্থান ‘সংরক্ষণ’ করার নামে চাঁদাবাজির প্রস্তুতি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দোকান বসানোর জন্য পছন্দের স্থান বেছে নিলেই শুরু হচ্ছে টাকার দাবি। একটি দোকানের জন্য কোথাও ৫ হাজার, কোথাও ৭ হাজার, আবার কোথাও ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, রাস্তার পাশের কিছু বাড়ির মালিক কিংবা ভাড়াটিয়ারাও তাদের বাসার সামনে দোকান বসাতে হলে আলাদা টাকা দাবি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
একাধিক ব্যবসায়ী জানান, গত বছরও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাদের। দোকান বসানোর জন্য বাধ্য হয়ে একাধিক ব্যক্তিকে চাঁদা দিতে হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অর্থ না দিলে দোকান বসানো কিংবা ব্যবসা পরিচালনায় বিভিন্ন ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে অনেককে।
বিশেষ করে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চাঁদাবাজি বেড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা এখনও ভুলতে পারেননি ব্যবসায়ীরা। গত বছর পরিস্থিতি এতটাই খারাপ আকার ধারণ করেছিল যে চাঁদাবাজি বন্ধের দাবিতে রাজশাহী মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব মোঃ রফিকুল ইসলাম রবি প্রকাশ্যে মাইকিং করে ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন।
ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন, মেলা শুরুর আগেই যখন চাঁদাবাজরা প্রকাশ্যে সক্রিয় হয়ে উঠছে, তখন মেলা চলাকালে তাদের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে? দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা কি আবারও চাঁদাবাজদের কাছে জিম্মি হবেন?
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও দর্শনার্থীদের অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারির কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে এখনও দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। ফলে রথ মেলা শুরুর আগেই নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী এই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবকে ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে প্রশাসন কি একটি স্বচ্ছ ও নিরাপদ মেলা উপহার দিতে পারবে? নাকি প্রতি বছরের মতো এবারও ব্যবসায়ীদের গুনতে হবে অবৈধ চাঁদার খেসারত?
সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা চান, রথ মেলার আনন্দ যেন কোনো অসাধু চক্রের হাতে জিম্মি না হয়। প্রশাসনের কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপই পারে এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবকে চাঁদাবাজিমুক্ত রাখতে এবং রাজশাহীর সম্প্রীতি ও সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে মেলাটিকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলতে।
সম্পাদক: ও প্রকাশক : মোঃ সাকিবুল ইসলাম স্বাধীন।
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
ডিএম ভবন(৪র্থ তলা), অলকার মোড়,বোয়ালিয়া ,রাজশাহী
ফোন নাম্বার- 01717-725868
ইমেইল: sokalerbulletin@gmail.com
www.sokalerbulletin.com