৩% সাজার হারকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা আখ্যা দিয়ে নারী-শিশু নির্যাতন রুখতে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার দাবি রাজশাহীর চার নাগরিকের
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশুর প্রতি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়া সহিংসতা, ধর্ষণ, নির্যাতন, হত্যা ও অনলাইন হয়রানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন রাজশাহীর চার বিশিষ্ট সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অধিকারকর্মী। আজ ২৫ মে ২০২৬ (সোমবার) গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা চলমান এই সংকটকে ‘অস্তিত্বের প্রশ্ন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে অবিলম্বে দেশে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার জোর দাবি জানান।
যৌথ বিবৃতিদাতারা হলেন- বরেন্দ্র অঞ্চলের উন্নয়ন গবেষণাধর্মী যুব সংগঠন ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ – ইয়্যাস ও ভঙ্গী নৃত্য শিল্পালয়ের সভাপতি, লেখক এবং অধিকার ও উন্নয়নকর্মী (শ্রেষ্ঠ যুব সম্মাননাপ্রাপ্ত) মো. শামীউল আলীম শাওন; ইয়্যাসের সহ-সভাপতি এবং উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী ফাতেমা আলী মেঘলা; ভঙ্গী নৃত্য শিল্পালয়ের সাধারণ সম্পাদক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মো. রবিন শেখ এবং ভঙ্গী নৃত্য শিল্পালয়ের নারী ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক নৃত্যশিল্পী ইসমত আরা মমি।
সংকটটির ভয়াবহতা নিয়ে লেখক এবং অধিকার ও উন্নয়নকর্মী মো. শামীউল আলীম শাওন বলেন,
‘‘একটি শিশু যখন ঘরে বা বাইরে কোথাও নিরাপদ থাকে না, আর বিচার না পেয়ে একজন অসহায় বাবা যখন শেষ পর্যন্ত বলেন- ‘আর বিচার চাই না, আল্লাহর কাছে ছেড়ে দিলাম’ তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সুরক্ষার মৌলিক চুক্তি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ৩ শতাংশ সাজার হার আর সাড়ে তিন বছরের বিচার-বিলম্ব কোনো সভ্য দেশের চিত্র হতে পারে না। এই আস্থার ভাঙনই বাংলাদেশের সবচেয়ে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকট। এই কাঠামো আমূল না বদলালে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক অমানবিক ও হিংস্র বাস্তবতায় নিমজ্জিত হবে।’’
যৌথ বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ সাম্প্রতিক কিছু লোমহর্ষক ঘটনার অবতারণা করে বলেন, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি দীর্ঘ ও পদ্ধতিগত রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার দৃশ্যমান প্রকাশ। ঢাকার একটি আবাসিক এলাকায় সাত বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা এবং অপরাধ গোপনের চেষ্টা, একটি ধর্মীয় শিক্ষাতন প্রতিষ্ঠানে ১২ বছরের এক শিক্ষার্থী শিক্ষকের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়ে গর্ভবতী হওয়া কিংবা মফস্বলের একটি জেলায় আট বছরের এক শিশু পারিবারিক বেড়ানো শেষে নির্মম নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর আদালত রায় দিলেও এক বছর ধরে তা কার্যকর না হওয়া; আমাদের বিচার ব্যবস্থার ভঙ্গুর রূপটিই ফুটিয়ে তোলে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই সংকটের গভীরতা কেবল মুখের কথা নয়। তা বিভিন্ন স্বাধীন ও সরকারি সংস্থার একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে যাচাইকৃত তথ্য-উপাত্তে স্পষ্ট। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালে সারাদেশে রেকর্ড ৭,০৬৮টি ধর্ষণ মামলা দায়ের হয়েছে, যার মধ্যে ১,৮৯৭ জনই শিশু। একই বছর নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১,৯৩৯টি। অন্যদিকে, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, বছরটিতে ৭৮৬ জন নারী ও মেয়ে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৫৪৩ জনই ছিল অবুঝ মেয়েশিশু; যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। চলতি ২০২৬ সালের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (অঝক) নিশ্চিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত মাত্র সাড়ে চার মাসে দেশে ১১৮টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ১৭টি শিশুকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। মে মাসের প্রথম ১১ দিনেই ১৮টি ধর্ষণ মামলার মধ্যে ১১টিই ছিল শিশু সংক্রান্ত।
যৌথ বিবৃতিতে ইয়্যাস সভাপতি শামীউল আলীম শাওন, সহ-সভাপতি ফাতেমা আলী মেঘলা, ভঙ্গী নৃত্য শিল্পালয়ের সাধারণ সম্পাদক মো. রবিন শেখ এবং নারী ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক ইসমত আরা মমি বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে এই সহিংসতার সবচেয়ে বড় জ্বালানি হিসেবে চিহ্নিত করেন।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণার (মে ২০২৬) সূত্র ধরে তাঁরা জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলার মাত্র ৩ শতাংশে আসামির সাজা হচ্ছে, আর ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে। আইনে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা নিষ্পত্তিতে গড়ে ১,৩৭০ দিন বা প্রায় সাড়ে তিন বছর লেগে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশের পরিসংখ্যানের তথ্য আরও ভয়াবহ। সামগ্রিক ফৌজদারি মামলায় সাজার হার যেখানে ২৮ শতাংশ, সেখানে শিশু-সংক্রান্ত মামলায় এই হার মাত্র শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশ এবং দেশের ১৫টি জেলায় সাজার হার শূন্য শতাংশ।
নেতৃবৃন্দ স্মরণ করিয়ে দেন, এই সংকট কেবল একটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নয়, এটি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ২৮ ও ৩২ এর সরাসরি লঙ্ঘন। ২০২৬ সালের এপ্রিলে সংসদে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল’ পাস হলেও ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইনের অভাব এবং অবৈজ্ঞানিক ‘টু-ফিঙ্গার টেস্ট’ পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় বাস্তব পরিবর্তন আসছে না।
এই চরম সংকট উত্তরণে ইয়্যাস ও ভঙ্গী নৃত্য শিল্পালয়ের পক্ষ থেকে অবিলম্বে নিম্নে বর্ণিত কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়-
জাতীয় জরুরি অবস্থা: চলমান পরিস্থিতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করা।
দ্রুত বিচার ও শূন্যপদ পূরণ: বিচার বিভাগীয় শূন্যপদ দ্রুত পূরণ করে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ও দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা।
সাক্ষী ও ভুক্তভোগী সুরক্ষা: সামাজিক বা রাজনৈতিক চাপে মামলা প্রত্যাহার রোধে সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দেওয়া।
মানসিক সহায়তা: ইউনিসেফ বাংলাদেশের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্যাতনের শিকারদের মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা প্রদান বাধ্যতামূলক করা।
ডিজিটাল নজরদারি: অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সাইবার বুলিং, ব্ল্যাকমেইল ও নারী-শিশু হয়রানি রোধে কঠোর নজরদারি চালানো।
স্বাধীন কমিশন গঠন: একটি ‘স্বাধীন শিশু সংস্কার কমিশন’ ও জাতীয় নির্যাতন ডেটাবেজ গড়ে তোলা।
যৌথ বিবৃতিতে দেশের তরুণ সমাজ, মানবাধিকার কর্মী, ধর্মীয় নেতা ও শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলা হয় যে, নারীকে সম্মান করার সংস্কৃতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টে নয়, প্রতিদিনের অভ্যাসে তৈরি করতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত পরিবর্তনকে সংগঠিত আন্দোলনে রূপ না দিলে এই কাঠামো বদলানো সম্ভব নয়। যে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে পারে না, তার নিজেকে সভ্য বলার অধিকার থাকে না উল্লেখ করে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে নিজেদের যৌথ সংগ্রাম ও প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন নেতৃবৃন্দ।



















