নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজশাহী মহানগরীতে দীর্ঘদিন ধরে চলা চুরি, ছিনতাই, সন্ত্রাসী কার্যক্রম, চাঁদাবাজি এবং মাদক কারবারে অতিষ্ঠ ছিল নগরবাসী। বিশেষ করে ৫ আগস্টের ঘটনার পর রাজশাহীর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে। নগরবাসী অভিযোগ করেছে—জরুরি মুহূর্তে ৯৯৯-এ ফোন করেও অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ সাড়া দেয়নি। সেনাবাহিনী থানায় প্রবেশের আগে পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার পুলিশ মাঠে নামেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসি ক্যামেরা অচল বা সরিয়ে ফেলার কারণে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। শিক্ষা ও শান্তির শহর রাজশাহী তখন চুরি, ছিনতাই, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং মাদক সিন্ডিকেটের দখলে চলে যায়। সাধারণ মানুষ জীবনযাত্রায় চরম অনিরাপত্তা অনুভব করছিল।
ঠিক এমন সংকটময় সময়েই দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) নতুন কমিশনার ড. জিললুর রহমান। যোগদানের পর থেকেই তিনি ভিন্নধর্মী পুলিশিং শুরু করেন, যা রাজশাহীতে দীর্ঘদিন দেখা যায়নি। দায়িত্ব গ্রহণের পরই তিনি দিন ও রাতভর নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় স্বচক্ষে টহল শুরু করেন। সোমবার মধ্যরাত থেকে ভোররাত পর্যন্ত তিনি সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে টহলে নেমে সন্দেহভাজনদের তল্লাশি করেন, দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলেন এবং মানুষের সমস্যার খোঁজখবর নেন। নগরবাসী বলছে—রাজশাহীতে কোনো পুলিশ কমিশনারকে আগে কখনো এভাবে নিজে মাঠে নেমে টহল দিতে দেখা যায়নি। তার এই সরাসরি উপস্থিতিতে ভেঙে পড়া পুলিশ বাহিনী আবারও সক্রিয় ও উদ্দীপিত হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
নগরীর কুমারপাড়ার দোকানদার রিপন জানান, প্রায় প্রতিটা এলাকাতেই পাতি নেতাদের দৌরাত্ম্য ছিল। তারা মোড়ে মোড়ে বসে নানা গল্প করত, নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন করত। কমিশনার যোগদানের পর সেই পাতি নেতাদের অনেকের আর দেখা পাওয়া যায় না। কেউ কেউ নীরবে বলছে—কিছুদিন সেফলি চলতে হবে, কমিশনার খুব কড়া মানুষ। তিনি আরও বলেন, সাধারণ জনগণ কিন্তু এতে খুশি। তারা মনে করছে, আবারও রাজশাহীতে শান্তি ফিরছে, ছেলে-মেয়েরা আবার নিশ্চিন্তে বাইরে যেতে পারবে, রাতের শহর আবারও স্বাভাবিক হবে।
রাজশাহী রেলস্টেশন এলাকার চা দোকানদার মাসুম বলেন, জীবনে কখনো কোনো পুলিশ এসে জিজ্ঞেস করেনি ব্যবসায় কোনো সমস্যা হয় কিনা, কেউ চাঁদা চাই কিনা। কিন্তু সেদিন রাতে হঠাৎ কয়েকজন পুলিশ এসে খোঁজ নিলো। তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন—ডিবি পুলিশ। পরে দোকানের কাস্টমার জানায়—যিনি এসেছিলেন তিনি পুলিশ কমিশনার! এতে তিনি বিস্মিত ও আনন্দিত। তার ভাষায়—উনার মতো একজন দায়িত্বশীল মানুষ রাজশাহীর জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। উনি দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েক দিনের মধ্যেই নগরীতে চুরি, ছিনতাই, মাদক অর্ধেক কমে গেছে। তিনি আশাবাদী—আগামীদিনে অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল হবে।
জিরোপয়েন্ট ও লক্ষীপুর এলাকার ব্যবসায়ীরাও বলছেন—যারা মাস্তানি করত, ছিনতাই করত, মাদক বিক্রি করত তারা এখন লুকিয়ে পড়েছে। তবে নিজেদের নিয়ে কিছুটা শঙ্কাও আছে; তারা ভয় পাচ্ছেন হঠাৎ পুলিশ এসে ফুটপাতের দোকান সরাতে বলবে কিনা। কিন্তু একইসঙ্গে তারা বলছেন—তাদের পরিবার-পরিজনেরা কমিশনারের কাজ দেখে খুশি। তারা মনে করছে—উনি রাজশাহীর অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এমন কঠোর, সৎ এবং ন্যায়পরায়ণ নেতৃত্ব তাদের বহুদিন পরে দেখা মিলেছে।
নতুন কমিশনার ড. জিললুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর রাতের টহল বৃদ্ধি পেয়েছে, মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার হয়েছে, অপরাধীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, ব্যবসায়ীরা স্বস্তি ফিরে পেয়েছে এবং পুলিশের সেবা আবারও জনগণের চোখে দৃশ্যমান হয়েছে। এতে নগরবাসীর পুলিশের প্রতি আস্থা বাড়ছে। সাধারণ মানুষ মনে করছে—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এমন দৃঢ় ও মানবিক নেতৃত্বই প্রয়োজন ছিল।
মোটকথা, নতুন কমিশনারের দৃঢ় অবস্থান, নিয়মিত মাঠে উপস্থিতি এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাজশাহীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে বদলে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের হতাশার পর নগরবাসী আবারও আশাবাদী হয়ে বলছে—রাজশাহী তার হারানো শান্তি ফিরে পাবে, এবং সেই পথে তারা অবশেষে সঠিক নেতৃত্ব পেয়েছে নতুন পুলিশ কমিশনার ড. জিললুর রহমানের মধ্যে।



















