স্টাফ রিপোর্টার, সকালের বুলেটিন: পাবনার সাঁড়াঘাট এলাকায় পদ্মা নদী থেকে গত ১৭ বছর ধরে হাইকোর্টের একটি পুরনো আদেশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে একাধিক প্রভাবশালী চক্র। এর নেতৃত্বে রয়েছে জাকারিয়া পিন্টু, সুলতান আহমেদ টনি ও আবু সাঈদ খান। এই বালুদস্যুদের তৎপরতায় হুমকির মুখে পড়েছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হার্ডিং ব্রিজ, লালন শাহ সেতু ও রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প।
২০০৮ সালে পরিবেশ রক্ষার কথা বলে পদ্মা নদীর ১২টি পয়েন্ট থেকে ১০ লাখ কিউবিক ফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি পায় তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান— মেসার্স বিশ্বাস এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স শাওন এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স আনোয়ারুল হক মাসুম। অনুমতির সীমা ছাড়িয়ে তারা ব্যাপকভাবে নদী খনন শুরু করে। মাঝখানে অংশীদার বিরোধ ও মামলার কারণে কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও, ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় নেতা মাহবুব আলম হানিফের প্রভাবে তারা পুনরায় সক্রিয় হয়।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, অনুমোদনের তুলনায় শতগুণ বেশি বালু প্রতিদিন উত্তোলন করা হচ্ছে। এ কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে কখনও বসতভিটা নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে, আবার কখনও ফসলি জমি দখল করে তৈরি হচ্ছে নদীর নতুন শাখা।
পরিবেশবিদদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে ব্রিজ ও প্রকল্পের ভিত্তি দুর্বল হয়ে ভূমিধস, বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প নদী থেকে মাত্র ৩-৪ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় এর উপরও রয়েছে সরাসরি বিপর্যয়ের আশঙ্কা।
গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর ঈশ্বরদী প্রশাসন সাময়িক অভিযান চালালেও ৩ জুলাই থেকে আবারও চক্রটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের একটি মহল ও পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় থাকছে। চক্রটি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সাংবাদিক ও স্থানীয়দের হুমকি, মিথ্যা মামলা এবং অস্ত্রের মহড়া দিয়ে ভীতি সৃষ্টি করছে।
অপরদিকে নাটোরের লালপুরের দিয়ার বাহাদুর বালু মহাল, যেখান থেকে সরকার প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়ে থাকে, সেখানে বৈধ ইজারাদাররা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। গত বছর রাসেল এন্টারপ্রাইজ ক্ষতির কারণে মামলা খেয়েছিল, আর এবার মোল্লা এন্টারপ্রাইজ ১০ কোটি টাকায় ইজারা নিলেও তারা কার্যক্রম চালাতে পারছে না। মাঝি-মাল্লাদের ওপর হামলা, নৌযান আটক ও ভয়ভীতির কারণে বৈধ ব্যবসায়ীরাও বেকায়দায় পড়েছেন।
মোল্লা এন্টারপ্রাইজের মালিক বলেন, “এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কেউ আর ইজারা নিতে চাইবে না। এখনই প্রশাসনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”
এলাকাবাসীর জোরালো দাবি:
- অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে ড্রেজার ও যন্ত্রপাতি জব্দ করা হোক
- জাকারিয়া পিন্টু, আবু সাঈদ, টনি বিশ্বাসসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক
- হার্ডিং ব্রিজ, লালন শাহ সেতু ও রূপপুর প্রকল্প রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ
- নতুন হাইড্রোগ্রাফি জরিপ চালিয়ে নদীর গতিপথ পুনর্নির্ধারণ
- বিআইডব্লিউটিএ, পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত করা হোক
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “নদী যাবে, সেতু যাবে, তারপর আমাদের ঘরবাড়ি… চোখের সামনে সব ধ্বংস হচ্ছে। কিন্তু প্রতিবাদ করলেই অস্ত্রের মুখে পড়তে হয়।”
বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি:
এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে জাতীয় স্থাপনাগুলো চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, পরিবেশ ও অর্থনীতির উপর।



















