নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ৫ আগস্ট স্বৈরাচার সরকার পতনের পর দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বিচারহীনতার প্রশ্ন ও নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যেই রাজশাহীতে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে জুলাই গণহত্যার একাধিক মামলার আসামি আলহাজ্ব মো. মহিদুল হকের দ্রুত জামিন। স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের দোসর ও প্রভাবশালী ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তি একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির মামলার আসামি হয়েও গ্রেপ্তারের মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে জামিন পাওয়ায় জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, মহিদুল হক অতীতে রাজশাহীর সাবেক মেয়র ও সংসদ সদস্য খায়রুজ্জামান লিটনের ঘনিষ্ঠ বলয়ের অংশ ছিলেন। তিনি সরাসরি দলীয় কোনো পদে সক্রিয় না থাকলেও রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে দীর্ঘদিন নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঘনিষ্ঠ বিষয়ে স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে আলহাজ্ব মো. মহিদুল হক নিজ অর্থায়নে পবিত্র হজ পালন করতে রাজশাহীর সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, তার স্ত্রী ও রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি মোসাম্মৎ শাহিন আক্তার রেণী, এবং তৎকালীন মহানগর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নাহিদ আক্তার নাহানদের নিয়ে সৌদি আরবের মদিনা ও মক্কায় অবস্থান গেছেন বলে জানা গেছে।

মহিদুল হক দীর্ঘদিন রাজশাহী দলিল লেখক সমিতির আজীবন সভাপতি ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, এই সংগঠনকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, যার মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন, নির্বাচনী প্রচারণা, জনবল সরবরাহ এবং প্রশাসনিক তদবির চালানো হতো। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, নৌকা প্রতীকের পক্ষে প্রচারণা ও সংগঠক হিসেবে তার ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান।
জুলাই মাসের সহিংসতায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় অর্থ ও লোক জোগান দেওয়া এবং কিছু ঘটনায় সরাসরি উপস্থিত থাকার অভিযোগেও মহিদুল হকের নাম উঠে আসে। এসব ঘটনায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।
এছাড়াও তার বিরুদ্ধে রাতারাতি শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে পুকুর ভরাট করে জমিতে রূপান্তর, অন্যের জমি নকল দলিলের মাধ্যমে নিজের বা ঘনিষ্ঠদের নামে লিখে নেওয়া, ভুয়া সার্টিফিকেট ও দলিল ব্যবহার করে লাইসেন্স সংক্রান্ত অনিয়ম, এবং অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। স্থানীয়দের মতে, এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহৃত হয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো— জুলাই গণহত্যার মামলায় গ্রেপ্তারের পর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে আদালত থেকে তার জামিন পাওয়া। আইন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে জুলাই সহিংসতার আসামিদের জামিন পাওয়া তুলনামূলক কঠিন হলেও মহিদুল হকের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি অস্বাভাবিক দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে।
এই জামিন কাণ্ডে রাজশাহী দলিল লেখক সমিতির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সুমন-এর নামও আলোচনায় এসেছে। একাধিক সূত্রের অভিযোগ, সুমন মহিদুল হকের ঘনিষ্ঠ এবং আদালতপাড়ায় প্রভাবশালী যোগাযোগ রক্ষা করেন। ৫ আগস্টের পর মহিদুল হক আত্মগোপনে থাকলেও সংগঠনের ভেতরে প্রভাব ধরে রাখতে সুমনকে সামনে রেখে অর্থ ও যোগাযোগ ব্যবহার করা হয়েছে। মহিদুল আত্মগোপনে থেকেও রাজশাহী দলিল লেখক সমিতি কার্যত নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জামিন প্রক্রিয়ায় সুমনসহ সমিতির একটি অংশ সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। এ বিষয়ে রাজশাহী দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুমনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,আমি এসব কিছুই জানি না। আমি অসুস্থ ছিলাম, বাসায় ছিলাম। মহিদুল হকের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে ৫ আগস্টের পর দলিল লেখক সমিতি দখলকে কেন্দ্র করে দড়ি টানাটানি, অভ্যন্তরীণ বিরোধ, সংবাদ সম্মেলনসহ নানা ঘটনাপ্রবাহের সময় মহিদুল হক বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনিক দপ্তরে সুমন ও তার ঘনিষ্ঠদের বসিয়ে রাখার অনুরোধ করেছিলেন—এমন তথ্য একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক পরিচয় ও পেশাগত সংগঠনের প্রভাব একত্রিত হলে গুরুতর অভিযোগের মুখে থাকা ব্যক্তিরাও সহজে আইনি সুবিধা পেতে পারেন। সচেতন মহলের মতে, মহিদুল হকের অতীত ভূমিকা, জুলাই গণহত্যায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং বিতর্কিত জামিন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে আইনের শাসন নিয়ে জনমনে আস্থার সংকট আরও গভীর হবে।



















