নিজস্ব প্রতিবেদকঃ সবুজ ও পুকুরের নগরী হিসেবে পরিচিত রাজশাহী-তে উন্নয়নের নামে একের পর এক গাছ কাটা ও জলাশয় ভরাটের ঘটনায় পরিবেশগত ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চলমান রাস্তা সম্প্রসারণ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে আবারও বৃক্ষনিধন শুরু হওয়ায় নগরজুড়ে সমালোচনা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজীব চত্বর থেকে কলাবাগান হয়ে ঘোষপাড়া মোড় পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণের অংশ হিসেবে সম্প্রতি অন্তত ৩০টি কাঠবাদামের গাছ কাটা হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে এসব গাছ অপসারণ করা হয়। ২০১০ সালের দিকে রাজশাহী সিটি করপোরেশন এসব গাছ রোপণ করেছিল, যা দীর্ঘ ১৬ বছরে বড় হয়ে নগরবাসীর জন্য ছায়া ও পরিবেশগত ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল।
সরেজমিনে দেখা যায়, কোথাও শ্রমিকরা গাছে উঠে ডাল কাটছেন, আবার কোথাও গোড়া থেকে করাত দিয়ে গাছ ফেলা হচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে অনেক পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, এ এলাকায় যানবাহনের চাপ তেমন নেই। অপ্রয়োজনীয়ভাবে গাছ কাটা হচ্ছে। উন্নয়নের নামে বারবার প্রকৃতি ধ্বংসের এমন উদ্যোগ তাদের বোধগম্য নয়। তাদের অভিযোগ, ফ্লাইওভার নির্মাণের কোনো প্রয়োজন ছিলনা সাবেক পলাতক মেয়র লিটন লুটপাট করার জন্য এই প্রকল্প শুরু করে। কেউ কেউ দাবি করেন, অতীতে এই প্রকল্প ঘিরে অনিয়ম ও স্বার্থসংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছিল এবং সেই সময়ও বহু পুরোনো গাছ কাটা হয়েছিল।
গাছ কাটার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের সরদার মো. গাজি জানান, সিটি করপোরেশন থেকে নিলামে গাছগুলো কিনে একজন ব্যবসায়ী এগুলো কাটছেন এবং কয়েকদিন ধরে কাজ চলছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) নির্বাহী প্রকৌশলী (উন্নয়ন) মাহমুদুর রহমান বলেন, বন বিভাগের অনুমোদন ও প্রাক্কলন অনুযায়ী নিয়ম মেনেই গাছগুলো বিক্রি করা হয়েছে। তিনি জানান, ফ্লাইওভার নির্মাণের ফলে সড়কের একপাশ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় তা প্রশস্ত করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সড়কের প্রস্থ সাড়ে তিন মিটারেরও কম। তাই গাছ অপসারণ করে সড়ক সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ড্রেনের ওপর ফুটপাত নির্মাণ করা হবে এবং সেখানে নতুন করে গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন পরিবেশবিদরা। বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, পরিপক্ব গাছ কেটে নতুন গাছ লাগানোর আশ্বাস পরিবেশগত ক্ষতি পূরণ করতে পারে না। উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ সংরক্ষণকে গুরুত্ব না দিলে তা কখনোই টেকসই হবে না।
দীর্ঘদিন ধরেই রাজশাহীতে একদিকে পুকুর ভরাট, অন্যদিকে বৃক্ষনিধনের অভিযোগ নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। বিশেষ করে নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাশয় হারিয়ে যাওয়া ও পুরোনো গাছ কাটা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও স্থায়ী সমাধান না আসায় উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে।
পরিবেশ সচেতন নাগরিকদের মতে, উন্নয়ন ও পরিবেশ—দুটির মধ্যে সমন্বয় না হলে ভবিষ্যতে রাজশাহীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে।



















