নিজস্ব প্রতিবেদকঃ পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে অনিয়ম ও দুর্নীতি আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়—এটি এখন কার্যত একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতির অন্যতম সক্রিয় চরিত্র হিসেবে সামনে এসেছে সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের অফিস সহকারী কর্মচারী হৃদয়ের নাম। অভিযোগ অনুযায়ী, বেতনভুক্ত কর্মচারী হয়েও নিয়মিত অফিস ডিউটির চেয়ে তার মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে দালালি ও ঠিকাদারদের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতা। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, পশ্চিমাঞ্চল রেলে এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে অনেকেই চাকরি পেতে বেতনের চেয়েও বেশি অর্থ ব্যয় করছেন, একমাত্র উদ্দেশ্য—যে কোনোভাবে অবৈধ অর্থ উপার্জন করা। নৈতিকতা, আইন কিংবা জবাবদিহিতা এখানে গৌণ হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ১, ৩ ও ৫ বছর মেয়াদি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকে ঘিরে যে নিয়োগ বাণিজ্য চলছে, তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন হৃদয়—এমন অভিযোগ উঠেছে রেল কর্মকর্তা ও একাধিক ঠিকাদারের পক্ষ থেকে। রাজশাহীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যোগ্যতার বদলে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি শিবগঞ্জ উপজেলার আজমদপুর গ্রামের মোজাহিদ (পিতা: আক্তার আলী)কে সৈয়দপুরে ডেলি লেবার হিসেবে যোগদান করানো হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যদিও তিনি সৈয়দপুরের সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে কর্মরত, তার বেতন আসে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে। এই নিয়োগের বিনিময়ে হৃদয় মোজাহিদের কাছ থেকে মোট ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ৭০ হাজার টাকা নগদ এবং ৯০ হাজার টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হৃদয়ের ব্যবহৃত নম্বরে গ্রহণ করা হয়। খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, এই টাকার মধ্যে ৬০ হাজার টাকা হৃদয় ও আরেক পক্ষ ভাগাভাগি করেন এবং বাকি ১ লাখ টাকা ‘অফিস খরচ’ দেখিয়ে নিজের কাছে রাখেন, যেখানে হৃদয়ের কমিশনও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এ বিষয়ে সৈয়দপুরের জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মারুফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্বীকার করেন যে মোজাহিদ যোগদান করেছে, তবে কোনো আর্থিক লেনদেন সম্পর্কে তিনি অবগত নন এবং তার কাছে কোনো টাকা দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, কে কোথায় কাজ করবে—এ ধরনের সিদ্ধান্ত রাজশাহী অফিস থেকেই নির্ধারণ করা হয়। আপনি রাজশাহীর সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পশ্চিম) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি বলতে পারবেন নিয়োগ প্রক্রিয়া কীভাবে হয়েছে। আমার কাজ সংশ্লিষ্ট কর্মীকে কাজ বুঝিয়ে দেওয়া সেটা বুঝে নেওয়া।
এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে রাজশাহীর সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পশ্চিম) মো. আনোয়ারুল ইসলামকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন না ধরায় তার পূর্ণ বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযুক্ত হৃদয় মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেন এবং বলেন, ‘এই তথ্য আপনাকে কে দিয়েছে—আপনার কোন সহকর্মী নাকি অন্য কেউ?’ তবে একই সঙ্গে তিনি রবিবারে সাক্ষাৎ করে ‘চা খেতে খেতে’ কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এদিকে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেন যাচাই করে ৯০ হাজার টাকা হৃদয়ের ব্যবহৃত নম্বরে পৌঁছানোর প্রমাণ মিলেছে।
এই বিষয়ে মোজাহিদের মা নাজমিন খাতুন মুঠোফোনে সোজা সাপ্টা জবাব দিয়েছে কে কোথায় কাজ করবে, কে কাকে টাকা দিবে না দিবে সেটাই আপনাদের জানার কোন প্রয়োজন নাই। আমরা বুঝবো হৃদয়ের সাথে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলে নিয়োগ বাণিজ্য ও সংশ্লিষ্ট অনিয়মের এই অভিযোগ ঘিরে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। আরও বিস্তারিত তথ্য আসলে সেগুলিও প্রকাশ করা হবে।



















