নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ৫ আগস্টের স্বৈরাচার সরকার পতনের পর দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগে রাজশাহীতে অপরাধ, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অভিযোগ বেড়ে যায় যা বর্তমান পুলিশ কমিশনার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার চেষ্টায়। এমন পরিস্থিতিতে আলোচনার কেন্দ্রে আসে জুলাই গণহত্যার একাধিক মামলার আসামি আলহাজ্ব মো. মহিদুল হকের দ্রুত জামিন, যা ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে বিএনপির অঙ্গসংগঠন ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার ভূমিকা নিয়ে শহরজুড়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মহিদুল হক অতীতে রাজশাহীর সাবেক মেয়র ও সংসদ সদস্য খায়রুজ্জামান লিটনের ঘনিষ্ঠ বলয়ভুক্ত ছিলেন। দলীয় পদে সক্রিয় না থাকলেও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মহিদুল হক রাজশাহী দলিল লেখক সমিতির আজীবন সভাপতি ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সংগঠনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন, নির্বাচনী প্রচারণা ও প্রশাসনিক তদবির পরিচালিত হতো।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, নৌকা প্রতীকের পক্ষে প্রচারণা ও জনবল সরবরাহেও তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন।
জুলাই মাসের সহিংসতায় ছাত্রদের ওপর হামলা, গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় অর্থ ও লোক জোগান দেওয়া সহ সশরীলে উপস্থিতির অভিযোগেও মহিদুল হকের নাম উঠে আসে। এসব ঘটনায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, মহিদুল হক রাতারাতি শ্রেনী পরিবর্তন করে পুকুরকে জমি করেছেন। একাধিক ক্ষেত্রে অন্যজনের জমি নকল দলিল করে নিজের বা অন্যের নামে লিখিয়ে দিয়েছেন। ভুয়া সার্টিফিকেট ও দলিল ব্যবহার করে অনিয়ম চালানো, স্থানীয়দের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, এবং তার বিরুদ্ধে মামলা করা ও অভিযোগকারীদের মামলা ফাঁসিয়ে দিয়ে হয়রানি করার ঘটনায় তিনি আলোচিত ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এসব কর্মকাণ্ডের পিছনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়েছিল।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, জুলাই গণহত্যার মামলায় গ্রেপ্তারের পর এক সপ্তাহর মধ্যেই তিনি রাজশাহী আদালত থেকে জামিন পান, যা নিয়ে আইনজীবী মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনা সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আরএমপি ডিবি পুলিশের অভিযানে ২১ জানুয়ারি বোয়ালিয়া থানার ২৮ নাম্বার মামলায় মহিদুল হক আটক হয়। আটক হওয়ার পর রাজশাহীর ডিবি অফিসে দলবল নিয়ে উপস্থিত হন সিটি কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব ইমদাদুল হক লেমন নেতিত্তে ও তার সহযোগী শাহমখদুম থানার ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক কাফি সহ অনেকে। আরএমপি ডিবি পুলিশকে আসামী ছেড়ে দিয়ে ধামাচাপা দেয়ার অনুরোধ সহ অর্থের প্রলোভন দিয়ে ব্যর্থ হয়ে , খারাপ আচরণ, ভয়ভীতি, গালাগালি সহ মব সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়। ২২ তারিখ তাকে ডিবি পুলিশ কোর্টের মাধ্যমে তাকে জেলে প্রেরণ করে।
কিন্তু জুলাই শহীদের রক্তের দাগ যার হাতে লেগে সেই ব্যক্তি ১ সপ্তাহর মধ্যে ২৮ তারিখে জামিনে বের হয়। কিন্তু বের হওয়ার পরই রাস্তায় বোয়ালিয়া থানার পুলিশ মামলা নাম্বার -২০ এর এজাহার ভুক্ত আসামি হিসেবে আটক করে নিয়ে থানায় যায়। আটকের পর এবার বোয়ালিয়া থানাতেও একই চেষ্টা চালানো হয় এমদাদুল হক লেমনের নেতৃত্বে— এমন অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় প্রশাসনের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়।
উল্লেখ্য, লেমন সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ‘চাঁদাবাজদের তালিকা’-তে শীর্ষে থাকা ব্যক্তি হিসেবে আলোচনায় আসেন। সেই সময়ই এক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা দাবির মামলা হওয়ার পর ছাত্রদল নেতা ইমদাদুল হক লেমন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন। সে সময় তিনি দাবি করেছিলেন, রাজনৈতিকভাবে হেয় করতেই তাকে এসব ঘটনায় জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
জামিন কান্ডে রাজশাহী দলিল লেখক সমিতির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সুমন এর নামও আলোচনায় এসেছে। একাধিক সূত্রের অভিযোগ, সুমন মহিদুল হকের ঘনিষ্ঠ এবং আদালতপাড়ায় প্রভাবশালী যোগাযোগ রক্ষা করেন। ৫ আগষ্টের পর মহিদুল আত্মগোপনে থাকলেও সুমনকে ছত্রছায়া দিয়ে অবোধ্য অর্থ ও প্রভাব খাটিয়ে সুমনকে সাধারণ-সম্পাদক হিসেবে বসিয়ে রেখেছে। মহিদুল আত্মগোপনে থেকেও রাজশাহী দলিল লেখক সমিতি নিয়ন্ত্রণ করছে বলে জানা গেছে।
জামিন প্রক্রিয়ায় সুমন সহ দলিল লেখক সমিতির একটি অংশ সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। আইন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে জুলাই সহিংসতার আসামিদের জামিন পাওয়া কঠিন হলেও মহিদুল হকের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি অস্বাভাবিক দ্রুত হয়েছে, যা স্বাভাবিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এই বিষয়ে জানতে ছাত্রদল নেতা ইমদাদুল হক লেমনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার সহযোগী কাফির সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, আমরা ডিবি অফিস ও বোয়ালিয়া থানায় শুধু খাবার দিতে গিয়েছিলাম, এর বাইরে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। মহিদুল আমাদের বন্ধুর চাচা হওয়ায় খোঁজখবর নিতেই সেখানে যাওয়া। ডিবি অফিসে আমরা কয়েকজনই ছিলাম, তবে বোয়ালিয়া থানায় তুলনামূলকভাবে লোকজন কিছুটা বেশি ছিল। তাকে ছাড়ানোর বিষয়ে কোনো কথাবার্তা হয়নি। তবে বোয়ালিয়া থানায় মহিদুলের ছেলে কাষ্টরিতে মহিদুল অবস্থানকালে একটি ছবি তুলেছিল—সে কারণে পুলিশ তার মোবাইল ফোন ফরমেট করতে চাইলে এ নিয়ে সামান্য বাকবিতণ্ডা হয়।
পুলিশ সূত্র ও ছাত্রদলের একাধিক সূত্রে জানা যায়, মহিদুল হককে ছাত্রদল নেতা ইমদাদুল হকের চাচা হিসেবে দাবি করা হচ্ছে।
রাজশাহীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক বিরোধ সুস্পষ্ট হলেও এই ঘটনায় দুই পক্ষের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন— অনিয়ন, দুর্নীতি সহ জুলাই গণহত্যার মামলায় আসামী কোন রাজনৈতিক নেতার যদি রক্তের বা আত্মীয় হয় তাহলে কি তার বিরুদ্ধে আইন গত ব্যবস্থা গ্রহণ হবে না। এমন ব্যক্তির জন্য রাজনৈতিক প্রভাব ও দলের নেতা কর্মীদের নিয়ে প্রশাসনের সাথে দূর ব্যবহার করবে। যদি তার পরিবারের হয় তাহলে পারিবারিক ভাবে পরিবারে লোক নিয়ে অনুরোধ নয়তো সঠিক প্রমাণ হাজির করলে সেটা আইন কে শ্রদ্ধা ও রাজনৈতিক ভাবেও সঠিক হয়তো। তানা করে মব সৃষ্টির চেষ্টা দলীয় লোক নিয়ে ২ বার এগুলি শহীদ জিয়ার আদর্শের বাইরে। নাগরিক সমাজের মতে, এসব প্রশ্নের সুষ্ঠু তদন্ত না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের প্রভাব খাটিয়ে অপরাধীদের ছাড়িয়ে নেওয়ার সংস্কৃতি আরও শক্ত হবে।
৫ আগস্ট–পরবর্তী প্রেক্ষাপটে রাজশাহীতে আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও প্রভাবশালী আসামিদের দ্রুত জামিন ও রাজনৈতিক তৎপরতা সেই প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি না হলে জনমনে আস্থার সংকট আরও গভীর হবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।



















