নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজশাহীর নাট্যাঙ্গনে যাঁর নাম উচ্চারিত হতো সবচেয়ে বেশি, সেই মোঃ তাজুল ইসলাম আর নেই। রাজশাহী থিয়েটার ও কচিপাতা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা এই বর্ষীয়ান নাট্যজন বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে নগরীর ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাইহি রাজিউন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (২৪ জুলাই) জুম্মার নামাজের পর নগরীর টিকাপাড়া জামে মসজিদে মরহুমের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরবর্তীতে তাঁকে টিকাপাড়া গোরস্থানে দাফন করা হবে।
রাজশাহী থিয়েটার আর কচিপাতা থিয়েটার — এই দুই নামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে একটাই মানুষের নাম, রাজশাহীর নাট্যাঙ্গনে সেই একটা নাম বললেই সবাই চেনে — মোঃ তাজুল ইসলাম। ১৯৯৮ সালে গড়ে তোলা রাজশাহী থিয়েটার আর ২০০০ সালে নিজ বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত কচিপাতা থিয়েটার, এই দুই প্রতিষ্ঠানের হাত ধরেই তিনি হয়ে উঠেছেন শহরের সংস্কৃতিচর্চার এক জীবন্ত প্রতীক।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ থেকে সেরা সম্মাননা, শিল্পকলা একাডেমীর স্বীকৃতি, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনে দু’বার নির্বাচিত কেন্দ্রীয় পরিষদ সদস্য, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সাবেক সমন্বয়কারী — এতসব অর্জনের পরও পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব কষেননি কখনো। পেশায় রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা হয়েও তাঁর আসল প্রাণ ছিল মঞ্চে।
শৈশব থেকেই অভিনয়-থিয়েটারের প্রতি টান ছিল তাঁর, পরিবার থেকেও পেয়েছিলেন প্রশ্রয়। কৈশোর পেরোতে না পেরোতেই মনে হয়েছিল, নিজের একটা থিয়েটার না হলে জীবন যেন অসম্পূর্ণ। সেই তাগিদ থেকেই জন্ম রাজশাহী থিয়েটারের। পদ্মা মঞ্চ থেকে শুরু করে বড়কুঠি মুক্তমঞ্চ, লালন মঞ্চ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ অডিটোরিয়াম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তন, রাকসু ভবন — শহরের প্রায় প্রতিটি সাংস্কৃতিক মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি ছাড়া যেন অনুষ্ঠানই সম্পূর্ণ হতো না। সিটি করপোরেশনের মেয়র নাট্য উৎসবেও মঞ্চ প্রস্তুত করা থেকে অনুষ্ঠান শেষ করা পর্যন্ত থাকতেন তিনি নিজে।
এরপর মনে হলো, শিশু-কিশোরদেরও তো দরকার নিজস্ব একটা জায়গা। ২০০০ সালে নিজের দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে নিজের বাড়িতেই গড়ে তোলেন কচিপাতা থিয়েটার। প্রথম শিক্ষার্থী নিজের ছোট মেয়ে, দুই ভাইয়ের সন্তান আর এলাকার পঞ্চম-ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া ছেলেমেয়েরা। পথে-মাঠে ডেকে নিয়ে, অভিভাবকদের সংস্কৃতির গুরুত্ব বুঝিয়ে — কোনো টাকা ছাড়াই শেখাতেন আর্ট, গান, আবৃত্তি আর নাটক। মুখে মুখে সুনাম ছড়াতে থাকায় অন্য এলাকার অভিভাবকরাও সন্তান পাঠাতে শুরু করেন।
বোসপাড়ায় নিজের বাড়ির প্রথম তলার দুই কক্ষ ভরে ওঠায় নিচতলা নাটকের জন্য আর ছাদ গান-আর্টের জন্য ছেড়ে দেন। এলাকার চিত্রশিল্পী তানিয়াকে বেতন দিয়ে আর্ট শেখানোর দায়িত্ব দেন। সংগীত শেখানোর দায়িত্বে ছিলেন আব্দুল মান্নান, তবলায় বৈশাখী টিভির বর্তমান রাজশাহী প্রতিনিধি ডলার। আর নৃত্য শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেন ওলিকে।
শুধু এখানেই থামেননি। নগরীর কয়েকদারা এলাকার বঞ্চিত সাঁওতাল পরিবারের সন্তানদের নিজের পকেট থেকে যাতায়াত ভাড়া দিয়ে থিয়েটারে নিয়ে আসতেন, যে যা শিখতে চাইত সেই সুযোগ করে দিতেন।
ফল আসতে দেরি হয়নি। কচিপাতা থিয়েটারের শিশুরা রাজশাহীর বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় জিততে শুরু করে, নাম ছড়িয়ে পড়ে জেলার সীমানা পেরিয়ে। পরে ইউনিসেফের সঙ্গে নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে মঞ্চনাটকের চুক্তি সই হয়, দাওয়াত আসে ঢাকা-বগুড়াসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে। প্রতিযোগিতায় তাঁর ক্ষুদে শিল্পীরা পেছনে ফেলে দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা পড়া সিনিয়রদেরও। রাজশাহী থিয়েটার আর কচিপাতা থিয়েটার চালানোর ফাঁকে তিনি নিজে লিখেছিলেন দাওয়াত , ছক্কাপক্কার মতো জনপ্রিয় নাটক, যেগুলো বিভিন্ন জেলার মঞ্চে দর্শকদের মন জয় করে এবং প্রতিযোগিতায় তাঁর ক্ষুদে শিল্পীদের অভিনয়ে মুগ্ধ করে বহু পুরস্কার এনে দেয়।
সুনামের সঙ্গে এসেছে অনুদানও, যা দিয়ে তিনি সংগঠনের সদস্য ও তাদের পরিবারের জন্য সেলাই মেশিন কিনে প্রশিক্ষণ দেন, গনকপাড়া আর শিরোইলে দুটি দোকান করে দেন কর্মসংস্থানের জন্য। সময়ের সঙ্গে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে, মেয়েদের অনেকের বিয়ে হয়ে যায় — আর তাদের জায়গা পূরণ করার মতো নতুন ছেলেমেয়েও তিনি পরে আর পাননি। সেই সময় প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনে শিশুরাও অল্প বয়সেই কম্পিউটার-মোবাইলে আসক্ত হয়ে পড়ে, ফলে থিয়েটারের জীবনে তাদের ধরে রাখা সম্ভব হয়নি — যা ছিল তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
শিক্ষা বোর্ডের চাকরি থেকে বিনা পয়সার থিয়েটার-স্কুল, সাঁওতাল শিশুদের পাশে দাঁড়ানো থেকে ইউনিসেফের চুক্তি — এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজ চিরবিদায় নিলেন রাজশাহীর নাট্যাঙ্গনের এই প্রাণপুরুষ। তাঁর জায়গা রাজশাহীর নাট্যাঙ্গনে আর কেউ পূরণ করতে পারবে না বলেই মনে করেন তাঁর সহকর্মী ও গুণগ্রাহীরা। তাঁর সাথে সাথে সমাপ্তি ঘটল তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত নিজস্ব প্রতিষ্ঠান কচিপাতা থিয়েটারেরও।



















