
লেখক ও উন্নয়নকর্মী
মো. শামীউল আলীম শাওন
দেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, বিশেষ করে ধর্ষণ ও গণধর্ষণ, এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত সংবাদগুলো প্রমাণ করে এই জঘন্য অপরাধের মাত্রা কতটা উদ্বেগজনক। ২০২২ সালে বাবার হাতে মেয়ে ধর্ষিত হওয়ার এবং মা জড়িত থাকার মতো মর্মস্পর্শী ঘটনা যেমন আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে, তেমনি ২০২০ সালে নোয়াখালীতে গৃহবধূকে বর্বরোচিত নির্যাতন ও তার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনা সমাজের ক্ষয়িষ্ণু নৈতিকতার চিত্র তুলে ধরে। সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীর সামনে স্ত্রীকে গণধর্ষণ, হবিগঞ্জে ডাকাতি করে মা-মেয়েকে ধর্ষণ—এসব ঘটনা আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতির ভয়াল পরিণতি।
উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালে ১৬২৭ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন, যার মধ্যে ৩১৭ জন ছিলেন গণধর্ষণের শিকার। ২০১৮ সালে ৭৩২ জন ও ২০১৯ সালে ১৪১৩ জন ধর্ষণের শিকার হন। যদিও ২০২১ সালে এই সংখ্যা কিছুটা কমে ১৩২১ জনে দাঁড়ায়, ২০২২ সালে ৯৩৬ জন এবং ২০২৩ সালে ৫৪৭ জন ধর্ষণের শিকার হন। ২০২৪ সালে ৪০১ জন ধর্ষণের শিকার হন, যার মধ্যে ১০৫টি ছিল গণধর্ষণ।
আসকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ৩৮৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৯৭টি ছিল গণধর্ষণ। একই সময়ে ২৫১টি পারিবারিক নির্যাতন, ১০০ জন যৌন হয়রানির শিকার এবং ৪৯৭ জন শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে। চলন্ত বাসে ও ট্রেনে নারী যাত্রীদের শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের ঘটনা, এমনকি ধর্ষণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে এই অপরাধ কতটা লাগামহীন হয়ে উঠেছে।
বিচারহীনতার দুষ্টচক্র ও পর্নোগ্রাফির প্রভাব
এই ক্রমবর্ধমান সহিংসতার পেছনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের অভাব, প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়া এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা অন্যতম প্রধান কারণ। যখন ধর্ষিতা ও তার পরিবারকে চরিত্র হননের শিকার হতে হয়, তখন ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা ম্লান হয়ে যায়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে না পারলে ধর্ষণের মতো অপরাধ বন্ধ করা অসম্ভব।
‘বাংলাদেশে ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির সহজ বিস্তার এবং নারীর প্রতি সহিংসতা’ শীর্ষক একটি গবেষণায় উঠে এসেছে যে, দেশীয় অনলাইন ও মিডিয়ায় পর্নোগ্রাফিক কনটেন্টের বিস্তার নারীর প্রতি অবমাননাকর দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করছে। পোশাক বা আচরণ দেখে নারীকে ‘ভালো’ বা ‘মন্দ’ হিসেবে বিচার করার প্রবণতা বাড়ছে, এবং ‘মন্দ’ মনে হলে আক্রমণের মানসিকতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা পুরুষের মধ্যে নারীর প্রতি সহিংস মানসিকতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। এই সামাজিক ক্ষতি রোধে নৈতিকতার পাশাপাশি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
করণীয় ও সম্মিলিত পদক্ষেপ
পুলিশ সদরদপ্তর ২০১৫ সালেই নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলা দ্রুত রুজু করার নির্দেশনা জারি করলেও, অনেক সময় দেখা যায় থানায় মামলা নিতে বিলম্ব করা হয়। এটি বিচারহীনতার উদাহরণ বাড়ায়। তাই গুরুতর ও স্পর্শকাতর অপরাধগুলোর বিচারকার্য দ্রুত সম্পন্ন করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নাগরিকদের পারিবারিক ও নৈতিক মূল্যবোধের উন্নয়ন অপরিহার্য। শুধু সরকারের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলেই হবে না; সমাজের প্রতিটি স্তরের আন্তরিক সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ ছাড়া এই ভয়াবহ ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মিতি সানজানা উল্লেখ করেছেন,
বাংলাদেশে কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, সাক্ষী সুরক্ষা আইনের অভাব এবং আর্থিক ও মানসিক চাপ ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করছে। নারী অধিকার কেবল মানবাধিকার ইস্যু নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনে নারীর অপরিহার্য ভূমিকা বিবেচনা করে তাদের সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
২০২০ সালের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের পাঁচ বছর পরও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দুঃখজনক হলেও সত্য, কঠোর আইন, প্রচার-প্রচারণা এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও নারীর প্রতি সহিংসতা কমানো যাচ্ছে না, বরং বাড়ছে। এই জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি সকল নাগরিকের সচেতন ও সম্মিলিত প্রতিরোধ একান্তভাবে কাম্য। জননিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করে একটি সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে আমাদের সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
আসুন, আমরা সকলে মিলে এই সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে সোচ্চার হই এবং একটি ধর্ষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করি।



















