নিজস্ব প্রতিবেদক: পবিত্র মাহে রমজানের সিয়াম সাধনার মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের জনসেবাকে যখন সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে, তখন রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)-এর দুর্গাপুর শাখায় এক অন্ধকার চিত্র ফুটে উঠেছে। শাখা ব্যবস্থাপক মো. রবিউল ইসলাম সিরাজীর কর্মঘণ্টায় আয়েশি ঘুমের ছবি রোববার (১৫ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগ প্লাটফর্মে প্রকাশ পাওয়ার পর স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তবে কেবল দায়িত্ব অবহেলাই নয়, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য—প্রান্তিক কৃষকদের ঋণের টাকা নিয়ে লুটপাট, বিমার নামে অবৈধ অর্থ আদায় এবং সহকর্মীদের ওপর নিয়মিত মানসিক নির্যাতনের এক অভয়ারণ্য গড়ে তুলেছেন এই কর্মকর্তা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাকাব মূলত প্রান্তিক কৃষকদের সহায়তার জন্য গঠিত হলেও দুর্গাপুর শাখায় ব্যবস্থাপকের উচ্চ হারের ঘুষ বাণিজ্যের কারণে প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি কৃষি ঋণের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পরিবর্তে সচ্ছল ও প্রভাবশালীদের অনৈতিকভাবে ঋণ সুবিধা প্রদান করছেন। এছাড়া ঋণপ্রত্যাশীদের কাছে ‘ইন্স্যুরেন্স’ বা বিমার অজুহাত দেখিয়ে সরকারি নির্ধারিত ফি-র বাইরে মোটা অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে, যার কোনো বৈধ রসিদ দেওয়া হয় না। অফিসের নির্ধারিত সময়ে নিজ চেয়ারে বসে ঘুমানো তার প্রাত্যহিক রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে; কোনো গ্রাহক জরুরি প্রয়োজনে জাগিয়ে তুললে তিনি সেবা দেওয়ার পরিবর্তে উগ্র মেজাজে ফেটে পড়েন এবং সাধারণ মানুষদের অপমান ও লাঞ্ছিত করেন। কেবল গ্রাহক নয়, অফিসের নারী কর্মকর্তাদের দিয়ে ব্যক্তিগত কাজ করানো, অশালীন দৃষ্টিভঙ্গিতে হেনস্তা এবং প্রতিবন্ধী কর্মকর্তাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মাধ্যমে তিনি এক ধরনের ‘প্রশাসনিক দাসত্ব’ কায়েম করেছেন।
তার এই কর্মকাণ্ড সংবিধানের ২১ (২) অনুচ্ছেদ এবং ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এর সরাসরি লঙ্ঘন।
এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সকল সরকারি কর্মকর্তার নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক এবং সকাল ৯:০০ টা থেকে ৯:৩০ মিনিট পর্যন্ত আবশ্যিকভাবে নিজ কক্ষে অবস্থান করার যে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তিনি তা প্রকাশ্যেই অমান্য করছেন। ইতিপূর্বে লালমনিরহাট, নওগাঁ ও পুঠিয়া শাখায় কর্মরত থাকাকালীনও তার বিরুদ্ধে নারীঘটিত কেলেঙ্কারি ও মারধরের শিকার হওয়ার মতো গুরুতর প্রশাসনিক রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও ঊর্ধ্বতন মহলের একটি বিশেষ চক্রের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তিনি বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন।
সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে জানতে দুর্গাপুর শাখা ব্যবস্থাপক মো. রবিউল ইসলাম সিরাজীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কর্মঘণ্টায় ঘুমিয়ে থাকার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন, নির্ধারিত অফিস সময়ের আগেই তিনি কর্মস্থলে পৌঁছে গিয়েছিলেন এবং শারীরিক অসুস্থতার কারণে চোখ বন্ধ করে বিশ্রামে ছিলেন।
অন্যদিকে, এ বিষয়ে কথা বলতে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক রাজশাহী জোনাল কার্যালয়ের জোনাল ব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মহব্বত আলী বিশ্বাসের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ না করে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন। অতঃপর এমডি’স ভিজিলেন্স সেলের ডিজিএম বাবুল আক্তার সরদারকে কল করা হলে তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে রাকাব কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সচেতন মহলের মতে, এই ‘আশীর্বাদপুষ্ট’ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কেবল লোকদেখানো বদলি কোনো সমাধান নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট-এর উচিত অবিলম্বে বিশেষ অডিট পরিচালনা করে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া। নচেৎ, প্রান্তিক কৃষকের এই বিশেষায়িত ব্যাংকটি জনগণের আস্থা হারিয়ে দুর্নীতির এক কালো গহ্বরে নিমজ্জিত হবে।



















