সাকিবুল ইসলাম স্বাধীন ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ , ৫:৩৯:৪৪ প্রিন্ট সংস্করণ
বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায় অবৈধ পুকুর খনন ও ফসলি জমির টপসয়েল কাটার বিরুদ্ধে দৃঢ় ও কঠোর অবস্থান নিয়ে প্রশংসিত হচ্ছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) লায়লা নূর তানজু। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন এবং নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে জরিমানা, সরঞ্জাম জব্দসহ নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে অবৈধ পুকুর খনন প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।

দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই ফসলি জমিতে অবৈধভাবে পুকুর খননের প্রবণতা ছিল ব্যাপক। শত শত বিঘা জমি কেটে ধ্বংস করা হলেও পূর্বে প্রশাসনিক তৎপরতা ছিল সীমিত। তবে বর্তমান এসি ল্যান্ড দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই চিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্যমতে, এমন কোনো অবৈধ পুকুর খননের ঘটনা নেই যেখানে তিনি অভিযান পরিচালনা করেননি।
গত ১৩ জানুয়ারি দৈনিক সকালের বুলেটিনের সম্পাদক অভিযোগ পান—দুর্গাপুর উপজেলার ৭নং জয়নগর ইউনিয়নের আনুলিয়া বিলে দিনের আলোতেই প্রকাশ্যে ফসলি জমিতে পুকুর খনন ও মাটি বিক্রি চলছে। বিষয়টি সহকারী কমিশনার (ভূমি) লায়লা নূর তানজুকে হোয়াটসঅ্যাপে জানানো হলে তিনি জানান, নির্বাচনি তদন্তে ব্যস্ত থাকলেও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৪ জানুয়ারি রাতে আনুলিয়া বিলে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের সময় দুর্বৃত্তরা পালিয়ে গেলেও ঘটনাস্থল থেকে মাটি কাটার কাজে ব্যবহৃত দুটি ভেকু নিষ্ক্রিয় করা হয় এবং চারটি ব্যাটারি জব্দ করা হয়।

আনুলিয়া বিলে অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ভেকু নিষ্ক্রিয় করছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
এর আগে ১২ জানুয়ারি দেলুয়াবাড়ী ইউনিয়নের আমগ্রাম এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে একটি ড্রেজার মেশিন জব্দ এবং পাইপ ও ভাসমান ভেলা ধ্বংস করা হয়। ১১ জানুয়ারি কিসমত গনকৈর ইউনিয়নের উজানখলসী পূর্বপাড়া এলাকায় অনুমোদনবিহীন পুকুর খননের সময় ছয়জনকে আটক করা হয়। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ১৫(১) ধারায় দুই ভেকু চালককে ৫০ হাজার টাকা করে মোট ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং ভেকু নিষ্ক্রিয় করা হয়। বাকি চারজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার শর্তে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এছাড়া ৬ জানুয়ারি ঝালুকা ইউনিয়নের গৌরিহার এলাকায় এক ব্যক্তিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, ৫ জানুয়ারি এলপিজি গ্যাস অধিক মূল্যে বিক্রির দায়ে ২৩ হাজার টাকা জরিমানা এবং ৩ ডিসেম্বর আমগাছি বাজারে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির অপরাধে তিন ব্যবসায়ীকে ১৭ হাজার টাকা জরিমানাসহ একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে।
অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের বিষয়ে সকালের বুলেটিনকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) লায়লা নূর তানজু জানান, আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। এলাকাবাসী ও সাংবাদিকদের তথ্যের সহযোগিতায় নিয়মিত মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করছি এবং তা অব্যাহত থাকবে।
সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় থাকার প্রসঙ্গে সকালের বুলেটিনের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাজশাহীর পুঠিয়া, দুর্গাপুর ও বাঘমারা উপজেলায় এই সিন্ডিকেট বিশাল আকার ধারণ করেছে। অনেকে এটাকে ব্যবসায় পরিণত করেছে, তাই একবারে বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে থেকে নিয়মিত অভিযান, মামলা ও জরিমানা চালিয়ে গেলে ধীরে ধীরে এটি বন্ধ হবে বলে আমি আশাবাদী।
সকালের বুলেটিনের মাধ্যমে কৃষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সিন্ডিকেটের কারণে অনেকের ফসলি জমির উৎপাদন কমে যাচ্ছে। লাভের আশায় অনেক কৃষক ভুল করে পুকুর খননের অনুমতি চান—যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। যেসব জমি শ্রেণিগতভাবে পুকুর রয়েছে, সেগুলো সংস্কারের অনুমতি দেওয়া হবে। কিন্তু ফসলি জমিতে নতুন করে পুকুর খনন যেন কেউ না করেন—এই অনুরোধ সবসময় করছি। ফসলি জমি রক্ষা করলেই পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে।
দুর্গাপুরের বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা জানান, দীর্ঘদিন পর তারা একজন সৎ, সাহসী ও দায়িত্বশীল এসি ল্যান্ড পেয়েছেন। তাদের মতে, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের মদদে অবৈধ পুকুর খনন ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সাধারণ মানুষ অনুমতি চাইলে হয়রানির শিকার হতেন, অথচ প্রভাবশালীরা অবাধে পুকুর খনন চালিয়ে যেতেন। বর্তমানে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে সেই অনিয়ম অনেকটাই কমে এসেছে।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, সহকারী কমিশনার (ভূমি) লায়লা নূর তানজুর এই সাহসী ও নিরপেক্ষ ভূমিকা অব্যাহত থাকলে দুর্গাপুরের ফসলি জমি রক্ষা করা সম্ভব হবে। নিয়মিত অভিযান ও আইনের কঠোর প্রয়োগের ফলে অবৈধ সিন্ডিকেটের তৎপরতা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে। সৎ, যোগ্য ও নির্ভীক এই কর্মকর্তার উদ্যোগে দুর্গাপুরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে—এমনটাই মনে করছেন সাধারণ মানুষ।

















