নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজশাহীর বোয়ালিয়া মডেল থানাধীন শিরোইল কাঁচাবাজার এলাকায় অবস্থিত রাজশাহী বরেন্দ্র প্রেসক্লাবে সশস্ত্র হামলা ও চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় প্রেসক্লাবের সভাপতি রেজাউল করিমকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ ঘটনায় রাজশাহী বরেন্দ্র প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শামসুল ইসলাম বাদী হয়ে ছয়জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১০–১৫ জনকে আসামি করে বোয়ালিয়া মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, অভিযুক্তরা হলেন—বোয়ালিয়া থানার মিয়াপাড়া এলাকার মৃত ডব্লিউর ছেলে নুরে ইসলাম মিলন (৪৫), রাজপাড়া থানার মৃত মানিকের ছেলে সুরুজ আলী (৩০), নগরীর টিকাপাড়া এলাকার করিমের ছেলে মিশাল (৩০), বোয়ালিয়া থানার ষষ্টিতলা এলাকার সাইদ আলী (৩৮), বহরমপুর এলাকার মৃত মানিকের ছেলে ইব্রাহিম (৪০) এবং রেন্টু (৩০)।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত কয়েকদিন ধরে অভিযুক্তরা প্রেসক্লাব পরিচালনার নামে চার লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল। এর জেরে শনিবার (৭ মার্চ) রাত সাড়ে ৮টার দিকে দেশীয় অস্ত্র, চাপাতি, চাইনিজ কুড়াল ও ধারালো চাকু নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে প্রেসক্লাবে প্রবেশ করে তারা।
এ সময় তারা প্রেসক্লাবের সভাপতি রেজাউল করিমের কাছে চার লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রধান অভিযুক্ত নুরে ইসলাম মিলন পিস্তল বের করে তার মাথায় ঠেকিয়ে ভয়ভীতি দেখায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
একপর্যায়ে ক্লাবে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে হামলাকারীদের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এ সময় সুরুজ আলী ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে রেজাউল করিমের পেটে আঘাত করার চেষ্টা করলে তিনি হাত দিয়ে তা প্রতিহত করেন। পরে হামলাকারীরা তার কোমরের নিচে উরুতে একাধিকবার আঘাত করে গুরুতর জখম করে। এতে তার উরুতে ১৩টি সেলাই দিতে হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ সময় অন্য হামলাকারীরা লাঠিসোটা দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করে তাকে আহত করে। ক্লাবে উপস্থিত সাংবাদিকদের চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে কুমিল্লা-চ-৫১-০০২৮ নম্বরের একটি গাড়ি ফেলে রেখে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
পরে আহত রেজাউল করিমকে দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ভর্তি করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নূরে ইসলাম মিলন ও সুরুজ আলী দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছেন। মিলনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, অতীতে র্যাব তাকে হত্যা ও সহিংস অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার করলেও পরে জামিনে বের হয়ে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।
এছাড়া এলাকাবাসীর অভিযোগ, কোটা আন্দোলন দমনে তারা আওয়ামী লীগকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছিলেন এবং জুলাই গণহত্যা সংক্রান্ত মামলাতেও তাদের নাম রয়েছে বলে দাবি করেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের আরও দাবি, ৫ আগস্টের পর তারা কিছুদিন পলাতক ছিলেন। পরে রাজশাহী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাঈদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে বিভিন্নভাবে সমঝোতা করেন। ওই সূত্রে আবার রাজশাহীতে ফিরে এসে তারা আগের মতোই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা শুরু করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে এই প্রভাব আওয়ামী লীগের ছিল, এখন সেটি বিএনপির ছত্রছায়ায় চলছে—এটাই শুধু পার্থক্য।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি স্বেচ্ছাসেবক দলের আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আড়াল করতে একটি পরিকল্পিত সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রস্তুতি ছাড়া হঠাৎ করে লিখিত বক্তব্য পাঠ করার সময় ইব্রাহিম বারবার আটকে যাচ্ছিলেন এবং বক্তব্যের কিছু অংশ পড়তে গিয়ে বিভ্রান্ত হন ও মিথ্যা তথ্য উল্লেখ করেন। পরে ইব্রাহিম নিজেই বলেন, “সংবাদ সম্মেলনে তৎক্ষণিক লিখিত বক্তব্য না পড়ে রিভাইজ করে বা মুখস্থ করে বললেই ভালো হতো। আমি আমার সাংবাদিক বন্ধু সুরুজকে দিয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করতে বলেছিলাম। তার বন্ধু মিলন নিজেই স্ক্রিপ্ট লিখে দিয়েছিল। এজন্য পড়তে একটু সমস্যা হয়েছে।”
এছাড়া স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, একটি হত্যা মামলা হওয়ায় থেকে বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করেছে। পরে আদালতের আদেশে সাঈদকে জেল হাজতে পাঠানোর পরও তাকে ঘিরে বিভিন্ন প্রচারণা চালানো হয়। পুলিশি গ্রেপ্তার এড়ানো ও দলীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা থেকে রক্ষা পেতে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশ এবং কর্মসূচি প্রচারের ক্ষেত্রে মিলনসহ কয়েকজন সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, কিছু সুবিধাভোগী সাংবাদিক ও দুর্নীতিবাজ স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন মিলিত হয়ে ৫ আগস্টের পর এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় সাংবাদিক ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কিছু ব্যক্তি একত্রে বরেন্দ্র প্রেসক্লাবে হামলা চালিয়ে সভাপতি রেজাউল করিমকে আহত করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তরা পলাতক থাকায় তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর নামও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির সঙ্গে আলোচনা শেষে চিকিৎসা নিয়ে থানায় গিয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বোয়ালিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। হামলাকারীদের ব্যবহৃত একটি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
রাজশাহীর সাংবাদিক সমাজ এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।



















