নিজস্ব প্রতিবেদকঃ সকালটা রাজশাহীর অন্য দিনের মতোই ধীর ছন্দে শুরু হয়। সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে প্রাতর্ভ্রমণে বের হওয়া বয়োজ্যেষ্ঠদের আড্ডা জমে ওঠে। ঠিক তখনই একটি পরিচিত রিকশা এসে থামে। রিকশা থেকে নেমে আসেন সদ্য দায়িত্ব পাওয়া ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। নেই কোনো সাইরেন, নেই প্রটোকলের কড়াকড়ি—হাসিমুখে হাত তুলে সালাম দেন, কুশল বিনিময় করেন সবার সঙ্গে।
ভদ্রা এলাকার বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সরকারি গাড়ি প্রস্তুত ছিল, পুলিশের প্রটোকলের ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু তিনি তা নেননি। প্রায় ১০ বছরের সঙ্গী রিকশাচালক আব্দুল কুদ্দুসের রিকশাতেই চড়ে বসেন। কুদ্দুস বলেন, “মন্ত্রী হয়েও উনি আগের মতোই আছেন। আমার রিকশাতেই শহর ঘোরেন। এটা আমার জন্য গর্বের।”
সাহেববাজারে আড্ডা শেষে তিনি একটি কমিউনিটি সেন্টারে যান দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। সেখানে কিছু সময় কাটিয়ে দুপুরের দিকে ফেরার পথে দড়িখড়বোনার সেই ছোট্ট সেলুনে ঢোকেন—যেখানে প্রায় ৪০ বছর ধরে চুল কাটান তিনি। পরিচিত পরিবেশে কিছুটা সময় কাটিয়ে আবার রিকশায় চড়ে বাড়ির পথে রওনা দেন।
রিকশায় বাড়ি ফেরার সময়ও দেখা যায়, তিনি পথচারীদের দিকে হাত তুলে সালাম দিচ্ছেন। সাধারণ মানুষও হাসিমুখে সালাম জানাচ্ছেন তাঁকে। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী আব্দুর রব পান্না, যিনি দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর ছায়াসঙ্গী হিসেবে কাজ করছেন। পুরো সময়জুড়েই পান্নাকে তাঁর পাশে দেখা যায়—রিকশার পাশে হাঁটতে, কখনো পাশাপাশি চলতে, আবার কখনো সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে নিরাপত্তা ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করতে।
আব্দুর রব পান্না জানান, “সকালে প্রটোকলের জন্য পুলিশের গাড়ি ও সরকারি গাড়ি ছিল। কিন্তু স্যার নেননি। আগের মতোই রিকশায় বের হয়েছেন। তিনি মানুষের সঙ্গে মিশেই থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।” তিনি আরও বলেন, “আমি ১১ বছর ধরে তাঁর সঙ্গে আছি। দায়িত্ব যত বড়ই হোক, তাঁর জীবনযাত্রা ততটা বদলায়নি।”
৩২ বছর বয়সে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন মিনু। টানা ১৭ বছর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার নানা অধ্যায় থাকলেও ব্যক্তিগত অভ্যাসে পরিবর্তন খুব একটা আসেনি। নির্বাচনী প্রচারণা হোক কিংবা দলীয় কর্মসূচি—শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তাঁকে দেখা গেছে রিকশায় চড়ে গণসংযোগ করতে।
স্থানীয়দের ভাষায়, পদবি বদলেছে, দায়িত্ব বেড়েছে—কিন্তু মানুষের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়েনি। রাজশাহীর পথে এখনো দেখা যায় এক ভিন্ন দৃশ্য—মন্ত্রী রিকশায়, পাশে তাঁর বিশ্বস্ত রিকশাচালক, সঙ্গে ব্যক্তিগত সহকারী আব্দুর রব পান্না, আর সামনে চেনা শহর।
ক্ষমতার আনুষ্ঠানিকতার ভিড়ে এই সরল উপস্থিতিই যেন তাঁকে আলাদা করে দেয়। মন্ত্রী হলেও রাজশাহীর মানুষের কাছে তিনি এখনো সেই চেনা মানুষ—রিকশায় চড়ে পথচলা ‘মিনু ভাই’।



















