নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)-এর প্রশাসক নিয়োগকে ঘিরে রাজশাহীর রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে নতুন আলোচনার হাওয়া। সম্ভাব্য প্রশাসক হিসেবে একাধিক অভিজ্ঞ নেতার নাম সামনে এলেও তৃণমূল নেতাকর্মী ও নগরবাসীর একটি বড় অংশের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে মাহফুজুর রহমান রিটনের নাম। একই সঙ্গে সাবেক মেয়র ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ, সহসভাপতি ওয়ালিউল হক রানা এবং নেতা আবুল কালাম আজাদ-এর নামও আলোচনায় রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের আলোচনায় তরুণ ও প্রযুক্তিবান্ধব নেতৃত্বের প্রশ্নে রিটনের নামই তুলনামূলকভাবে বেশি উঠে আসছে।
সরেজমিনে নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণ মানুষের একটি অংশ মনে করছেন—ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, নগর ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন, সেবার গতি বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন কর্মঠ, সংগঠিত ও মাঠকেন্দ্রিক নেতৃত্ব। তাদের মতে, প্রশাসক এমন একজন হওয়া উচিত যিনি রাজনীতি ও প্রশাসন—উভয় ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞ, আবার তৃণমূলের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। এই প্রেক্ষাপটে সমর্থকদের দাবি, দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে মাহফুজুর রহমান রিটন দায়িত্ব পালনে সক্ষম হতে পারেন।
রাজশাহী সিটি কলেজ ছাত্রদল থেকে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। ছাত্রজীবনে কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক ও যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে সংগঠনকে সক্রিয় ও সুসংগঠিত করতে ভূমিকা রাখেন। আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারিতে নেতৃত্ব, কর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এবং দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে দৃঢ় অবস্থানের কারণে তিনি দ্রুতই নেতাকর্মীদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে মহানগর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তৃণমূলভিত্তিক কমিটি গঠন ও সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করেন। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতেও সম্পৃক্ত হন।
ছাত্ররাজনীতি থেকে যুবরাজনীতিতে এসে তিনি মহানগর যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক ও আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে আছেন। দলীয় সূত্রের দাবি, দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশ, মামলা-হামলা ও দমন-পীড়নের মধ্যেও তিনি মাঠে সক্রিয় থেকেছেন এবং সংগঠনকে সচল রেখেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ধারাবাহিক সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা ও তৃণমূলভিত্তিক গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে রাজশাহীর রাজনীতিতে প্রভাবশালী মুখে পরিণত করেছে।
অন্যদিকে প্রশাসক পদে আলোচনায় থাকা সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ২০১৩ সালে নির্বাচিত হলেও প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার কারণে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। তাঁর সমর্থকদের মতে, প্রশাসনিক দায়িত্ব পেলে অসমাপ্ত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে তিনি ভূমিকা রাখতে পারবেন। মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ জানিয়েছেন, দল যোগ্য মনে করলে তিনি দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত। সহসভাপতি ওয়ালিউল হক রানা কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। অন্যদিকে আবুল কালাম আজাদ প্রশাসক পদে সুযোগ পেলে নগর সেবায় কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং সাবেক মেয়রকে সম্মান জানানো হলে তা ইতিবাচক বার্তা দেবে বলে মত দিয়েছেন।
এ বিষয়ে মাহফুজুর রহমান রিটনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি সবসময় রাজনীতি করেছি জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য। ব্যক্তিগত পদ-পদবী কখনো আমার লক্ষ্য ছিল না। তবে দল ও জনগণ যদি আমাকে কোনো দায়িত্বের উপযুক্ত মনে করে, তাহলে সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।” তিনি আরও বলেন, “রাজশাহী আমার প্রাণের শহর। নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অসমাপ্ত প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনিক দায়িত্ব পেলে নাগরিক ভোগান্তি কমানোই হবে অগ্রাধিকার।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের ছয় সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে রাজনৈতিক সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় রাসিকেও দলীয় প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের ওপর নির্ভর করছে। এদিকে নগরবাসীর প্রত্যাশা—যে-ই প্রশাসক হন, তিনি যেন আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও সেবামুখী প্রশাসন নিশ্চিত করেন; স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রেখে নগর উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো না এলেও প্রশাসক নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজশাহীতে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত স্পষ্ট। তরুণ নেতৃত্ব বনাম অভিজ্ঞ নেতৃত্ব—এই আলোচনার মধ্যেই নগরবাসী অপেক্ষা করছে এমন একজন প্রশাসকের জন্য, যিনি দল-মত নির্বিশেষে নগর উন্নয়ন ও নাগরিক সেবাকেই অগ্রাধিকার দেবেন।



















