নিজস্ব প্রতিবেদকঃ একসময় বরেন্দ্রের মাঠে-ঘাটে সারি সারি তাল আর খেজুর গাছ। সেই গাছে ঝুলত বাবুই পাখির বাসা। শীতের ভোরে খেজুরের রস, গ্রীষ্মের দুপুরে তালের শাঁস — এসব ছিল এই অঞ্চলের মানুষের চিরচেনা জীবনের অংশ। কিন্তু সেই দিন এখন অনেকটাই স্মৃতি। একের পর এক গাছ কাটা পড়েছে, উজাড় হয়েছে দেশি প্রজাতি। তার বদলে এসেছে বিদেশি গাছ। ফলে পাখি কমেছে, খাদ্যবৈচিত্র্য কমেছে, বেড়েছে তাপমাত্রা, কমেছে বৃষ্টি। খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চল আরও কঠিন হয়ে উঠছে দিন দিন।
এই বাস্তবতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আজ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট ২০২৬) রাজশাহীর তানোর উপজেলার তালন্দ গ্রামে শুরু হলো এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। দুপুরে স্কুলের ছুটির ঘণ্টা বাজতেই শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুম ছেড়ে নেমে এলেন রাস্তায়। সঙ্গে শিক্ষক, এলাকার কৃষক-কৃষাণী আর গ্রিন কোয়ালিশনের সদস্যরা। তালন্দ গ্রামের ২ কিলোমিটার রাস্তার দুই ধারে তারা একসঙ্গে বপন করলেন ২ হাজার তাল বীজ, এক হাজার দেশি বড়ই বীজ, পাঁচশত নিম বীজ, দুইশত দেশি খেজুর, চারশত জামের বীজ, দেড়শত কাঁঠালের বীজ আর একশত তেঁতুল বীজ। এক রাস্তায়, এক বিকেলে — সাড়ে চার হাজারেরও বেশি দেশি বীজ।
এই আয়োজনের পেছনে ছিল উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক, গ্রিন কোয়ালিশন এবং তালন্দ আনন্দমোহন উচ্চ বিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগ। বাংলাদেশ সরকারের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মিলিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে ১০ লক্ষ দেশি প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ঔষধী গাছের বীজ বপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে আজকের এই উদ্বোধন।
উদ্বোধন করেন জাতীয় কৃষিপদকপ্রাপ্ত স্বশিক্ষিত কৃষি গবেষক ও গ্রিন কোয়ালিশন তানোর উপজেলার আহ্বায়ক কৃষক নুর মোহাম্মদ। বীজ হাতে নিয়ে তিনি বললেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে আগে অনেক তাল-খেজুরের গাছ ছিল। এই গাছগুলো শুধু ফল দিত না, বজ্রপাতও ঠেকাত। পাখিরা বাসা বাঁধত, বিশেষ করে বাবুই পাখির ঘর ঝুলত সেই তাল গাছে। কিন্তু এখন সেই গাছ নেই, পাখিও নেই। তিনি সরাসরি দাবি তুললেন — বরেন্দ্র অঞ্চলে তাল ও খেজুর গাছ কাটা এখনই বন্ধ করতে হবে।
একই সুরে কথা বললেন তালন্দ আনন্দমোহন উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মৃনাল কুমার পাল। তিনি বললেন, গাছ থাকলে পরিবেশ ভালো থাকে — এটা সবাই জানে। কিন্তু গাছ কমে যাওয়ার ফলে বরেন্দ্রে তাপমাত্রা বেড়েছে, বৃষ্টি কমেছে। এই অবস্থায় শুধু নতুন গাছ লাগালেই হবে না, বরেন্দ্রের যে শতবর্ষী বড় গাছগুলো এখনো টিকে আছে সেগুলো সরকারিভাবে সুরক্ষা করতে হবে।
বারসিকের নৃবিজ্ঞানী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শহিদুল ইসলাম বললেন আরও গভীর কথা। তাঁর মতে, বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব বৃক্ষবৈচিত্র্য আছে। সেই বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে সেই অঞ্চলের খাদ্য ও সংস্কৃতি। কিন্তু যখন সেই বৈচিত্র্য কমে যায়, তখন শুধু পরিবেশ নয়, পুরো বাস্তুসংস্থান ভেঙে পড়ে। তাই তিনি সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে সতর্ক করলেন — বরেন্দ্রে বৃক্ষরোপণ করতে হবে বরেন্দ্রের মাটি ও আবহাওয়া বুঝে, বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির গাছ লাগিয়ে নয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মনিরা খাতুন ও জয়ন্তী রানীসহ সকল শিক্ষক এবং প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী। এছাড়া ছিলেন বারসিকের প্রোগ্রাম অফিসার অমৃত কুমার সরকার, সহযোগী প্রোগ্রাম অফিসার উত্তম কুমার সরকার এবং বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি আতিকুর রহমানসহ এলাকার অনেকে।
তালন্দের সেই ২ কিলোমিটার রাস্তায় আজ যে বীজ পোঁতা হলো, কয়েক বছর পর সেগুলো হয়তো বড় গাছ হবে। আবার হয়তো ফিরে আসবে বাবুই পাখির বাসা। বরেন্দ্রের রুক্ষ মাটি আবার পাবে তার পুরনো সবুজের ছায়া।


















