নিজস্ব প্রতিবেদক: আজ ৬ আগস্ট ২০২৫, সকাল ১০টা ৩০ মিনিট। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪০ শয্যার আইসিইউতে চলছিল মেগা রাউন্ড। এ সময় মেডিসিন ওয়ার্ড থেকে এক তরুণ রোগীর জন্য জরুরি রেফারেল আসে—সাপে কাটা রোগী, বয়স মাত্র ২০ বছর, বাড়ি নওগাঁর মহাদেবপুর। রোগী যখন ট্রলিতে করে আইসিইউতে আসে, তখন তার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ, হৃদপিণ্ডও ধীরে চলছে। কনসালটেন্ট ডাক্তার ট্রলিতেই রোগীর শ্বাসনালীতে নল স্থাপন করেন এবং দ্রুত লাইফ সাপোর্টে দেওয়া হয়।
এই দৃশ্য এখন নতুন নয়। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ সূত্রে জানা গেছে—গত ১ জুন ২০২৫ থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত, মাত্র ৬৬ দিনে সাপে কাটা মোট ৩৩ জন রোগী আইসিইউতে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১৫ জন রাজশাহীর, ১১ জন নওগাঁর, বাকিরা চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও ঝিনাইদহ থেকে এসেছেন। এদের প্রায় সবাইই গুরুতর অবস্থায় আইসিইউতে পৌঁছেছেন।
চিকিৎসকদের ভাষায়, প্রতি বছর বর্ষায় সাপে কাটা রোগী আসে, কিন্তু গত ১৪ বছরে কখনও এত সংখ্যক রোগী আইসিইউতে ভর্তি হয়নি। আরও উদ্বেগজনক হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীদের ঘরের মধ্যেই সাপে কেটেছে।
২০২৫ সালে এসেও দেশের কোনো জেলা হাসপাতালেই এখনো সাপে কাটা রোগীর জন্য উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। না আছে পর্যাপ্ত এন্টিভেনম, না আছে কার্ডিয়াক মনিটরিং, না আছে লাইফ সাপোর্ট সুবিধা। ফলে গুরুতর রোগীদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালই শেষ ভরসা।
আইসিইউ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন—৩৩ জন রোগীর মধ্যে ৩২ জনই সুস্থ হয়ে ফিরেছেন, যা মহান আল্লাহর অশেষ কৃপা। একজন রোগী মারা গেছেন—যিনি হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যুপ্রায় অবস্থায় ছিলেন। সময়মতো চিকিৎসা পেলে তাকেও হয়তো বাঁচানো যেত।
প্রাণীবিদদের মতে, চলতি বর্ষায় অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে সাপেরা তাদের আবাস হারিয়েছে। ফলে খাবারের সন্ধানে মানুষের ঘরে ঢুকে পড়ছে। এই বিষয়টিকে স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখা দরকার।
সাপে কাটা রোগীদের বেশিরভাগই সাপকে দেখেননি, তারা ঘুমের মধ্যেই আক্রান্ত হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন—সাপে কাটলে একমাত্র করণীয় হাসপাতালে নেওয়া। ওঝা, কবিরাজ, ঝাড়ফুঁকে সময় নষ্ট করলে বিষ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন আইসিইউতেও বাঁচানো যায় না।
জনগণের দাবি, প্রতিটি জেলা হাসপাতালে সাপে কাটা রোগীর জন্য লাইফ সাপোর্ট ব্যবস্থা চালু করতে হবে।পর্যাপ্ত এন্টিভেনম ও প্রশিক্ষিত চিকিৎসক রাখতে হবে।তৃণমূলে সচেতনতা বৃদ্ধি ও ক্যাম্পেইন চালাতে হবে। সাপে কাটার পর রেফারেল ব্যবস্থাকে দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে।
মানুষ ঘরে ঘুমাতে গিয়ে সাপে কাটা পড়ছে। আর শহরের একটি হাসপাতালের ওপর চাপ পড়ছে শত কিলোমিটার দূরের মানুষেরও। এটা চলতে পারে না। জেলা পর্যায়ে আইসিইউ ও চিকিৎসার দাবি আজ সময়েরই দাবি।



















