নিজস্ব প্রতিবেদকঃ নাটোরের ঐতিহ্যবাহী তেবাড়িয়া পশুর হাটকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক গাড়ি থামিয়ে চালান আদায় এবং সাধারণ গরু ব্যবসায়ী ও খামারিদের হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর হাটের ইজারাদার আবুল হোসেন এবং রাজশাহীর আলোচিত ব্যক্তি মোখলেসুর রহমান মুকুল ওরফে ‘হুন্ডি মুকুল’-এর দিকে। স্থানীয়দের দাবি, তাদের যৌথ প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণে গড়ে উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট, যারা হাটের নাম ব্যবহার করে প্রধান সড়কেই প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি চালাচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তেবাড়িয়া হাটের আশপাশের প্রধান সড়কে পশুবাহী ট্রাক, লোসিমন, করিমন ও অন্যান্য যানবাহন জোর করে থামানো হচ্ছে। এরপর গরু নামিয়ে আটকে রেখে হাটের নামে ‘চালান’ কাটতে বাধ্য করা হচ্ছে। টাকা না দিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি আটকে রেখে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে হাটে প্রবেশ না করলেও জোরপূর্বক চালান ধরিয়ে টাকা আদায় করা হচ্ছে।
একাধিক গরুর ব্যাপারী ও গেরস্থ জানান, তেবাড়িয়া হাটের নির্ধারিত সীমানার বাইরেও এই কার্যক্রম চলছে। তাদের দাবি, এটি মূলত চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ভুয়া বা জোরপূর্বক চালান ব্যবহারের একটি কৌশল।
ভুক্তভোগী গাড়িচালক রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, তিনি গরু নিয়ে পাশের সিটি হাটে যাওয়ার পথে তেবাড়িয়া হাটের লোকজন তার গাড়ি থামিয়ে গরু নামিয়ে নেয়। তিনি বাধা দিলে হাটের নিয়োজিত লোকজন তাকে মারধর করে। পরে ২ হাজার ৪০০ টাকা আদায় করে একটি চালান ধরিয়ে দিলে তাকে যেতে দেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীর কাশিয়াডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা মোখলেসুর রহমান মুকুল দীর্ঘদিন ধরেই নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে এলাকায় পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ হুন্ডি ব্যবসা, অর্থ পাচার ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো সরকারি নথি এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি, তবে স্থানীয়দের মুখে এসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত।
আরও অভিযোগ রয়েছে, অতীতে রাজশাহীর সিটি হাটের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিতেন মুকুল। বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে সরাসরি সামনে না এসে তিনি নাটোরের দুলাল বেপারীর ছেলে আবুল হোসেনকে সামনে রেখে তেবাড়িয়া হাটের ইজারা নিয়েছেন। এরপর থেকেই রাস্তায় জোরপূর্বক চালান বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির অভিযোগ বাড়তে থাকে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার বা ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তেবাড়িয়া হাটের ইজারাদার আবুল হোসেন বলেন, “এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত ১৫-২০ জন সাংবাদিক ফোন দিয়েছে। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের কেন কৈফিয়ত দেবো? এটা নাটোর প্রশাসন বুঝবে।”
অন্যদিকে মোখলেসুর রহমান মুকুলের বক্তব্য নিতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে হোয়াটসঅ্যাপে কল দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এ বিষয়ে নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আরিফ হোসেন বলেন, “সাধারণ মানুষের ওপর এ ধরনের অন্যায় অত্যাচার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি আগে জানা ছিল না, এখন খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। হাইওয়ে পুলিশকেও রাস্তায় নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হবে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও খামারিদের দাবি, দ্রুত এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে তেবাড়িয়া হাটকে কেন্দ্র করে পশু ব্যবসায় ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হবে। তারা অবিলম্বে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।



















