মোঃ শামীউল আলীম শাওনঃ আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স’ বা কাঠামোগত সহিংসতা বলে একটি শব্দ আছে। এটি এমন এক পরিস্থিতি যেখানে কোনো দৃশ্যমান যুদ্ধ নেই, অথচ রাষ্ট্রের অব্যবস্থাপনা আর আমলাতান্ত্রিক জড়তায় সাধারণ মানুষ তিল তিল করে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে। গত ১১ থেকে ২২ মার্চের মধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করিডোরে আইসিইউর অভাবে যে ৩৩টি শিশু প্রাণ হারিয়েছে, তা এই কাঠামোগত সহিংসতারই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
আড়াই বছরের শিশু নুসায়বা মারা যাওয়ার চার দিন পর যখন তার বাবার ফোনে হাসপাতাল থেকে কল আসে—‘এখন একটি আইসিইউ বেড খালি আছে’—তখন বুঝতে হবে আমাদের পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থাটি কেবল স্থবির নয়, বরং এটি একটি অকেজো যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। মৃত সন্তানের জন্য আইসিইউ বেড বরাদ্দের এই ‘মরণোত্তর ডাক’ আসলে একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমাদের তথাকথিত উন্নয়নের গালে এক বিরাট চপেটাঘাত।
অবকাঠামোর বিড়ম্বনা: ৩৫ কোটির অট্টালিকা বনাম মরচে ধরা তালা
রাজশাহীর বহরমপুর এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা আধুনিক ২০০ শয্যার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালটি এখন এই অঞ্চলের মানুষের কাছে এক নিষ্ঠুর তামাশার নাম। ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ভবনটি ২০২৩ সালেই প্রস্তুত করা হয়েছে। সেখানে ৫৬টি অত্যাধুনিক আইসিইউ (NICU/PICU) শয্যার অবকাঠামো আছে, সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন আছে, এমনকি ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেমের সংস্থানও রাখা হয়েছে। অথচ তিন বছর ধরে ভবনটির গেটে ঝুলছে একটি মরচে ধরা তালা।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া ‘অর্গানোগ্রাম’ বা জনবল কাঠামোর দোহাইটি এখন আর ধোপে টেকে না। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে, যেখানে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হাজার মাইল দূরের মানুষের সাথে যোগাযোগ সম্ভব, সেখানে একটি জীবন রক্ষাকারী জনবল কাঠামো চূড়ান্ত করতে তিন বছর সময় লাগা কেবল অবহেলা নয়, এটি এক ধরনের অপরাধ। রামেক হাসপাতালের শিশু আইসিইউ প্রধান ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামালের সেই আক্ষেপ—“আমরা একটি বিছানা দিতে পারিনি”—আসলে নীতিনির্ধারকদের কানে পৌঁছানোর আগেই ৩৩টি ক্ষুদ্র কফিনে ঢাকা পড়ে গেছে।
স্মার্ট বাংলাদেশের মরীচিকা ও আঞ্চলিক বৈষম্য
বাংলাদেশ যখন স্মার্ট হেলথ-কেয়ারের স্বপ্ন দেখছে, তখন রাজশাহীর এই চিত্রটি এক ভয়াবহ ‘আঞ্চলিক বৈষম্য’ (Regional Disparity) ফুটিয়ে তোলে। ঢাকার যেকোনো বড় হাসপাতালে এ ধরনের সংকট তৈরি হলে কি নীতিনির্ধারকরা তিন বছর সময় নিতেন? উত্তরবঙ্গের ২ কোটি মানুষের জন্য মাত্র ১২টি শয্যা কি নীতিনির্ধারকদের ‘সমতা’র সংজ্ঞার সাথে খাপ খায়? রাজশাহীর মানুষের প্রাণের মূল্য কি তবে জাতীয় রাজনীতির মানচিত্রে কেবল একটি ভোটব্যাংক হিসেবেই সীমাবদ্ধ?
সাংবিধানিক অবমাননা ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) এবং ১৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। এছাড়া জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ (UNCRC)-এর ২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর সর্বোচ্চ অর্জনযোগ্য মানসম্পন্ন চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
অবকাঠামো এবং সরঞ্জাম প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল চালু না করে শিশুদের মেঝের করিডোরে মরতে দেওয়া সরাসরি এই আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এটি স্রেফ আমলাতান্ত্রিক ‘রেড-টেপিজম’ বা লাল ফিতার দৌরাত্ম্য নয়, এটি মানবাধিকারের এক চরম বিপর্যয়।
এখন যা প্রয়োজন: প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা
৩৩টি শিশুর মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, গৎবাঁধা চিঠি চালাচালির সময় আর নেই। পরিস্থিতির উত্তরণে এখনই প্রয়োজন:
১. জরুরি টেকনিক্যাল অডিট: দীর্ঘদিন ভবনটি বন্ধ থাকায় যন্ত্রপাতির ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন করে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভবন হস্তান্তর নিশ্চিত করা।
২. প্রেষণে কার্যক্রম শুরু: স্থায়ী নিয়োগের দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর বিশেষজ্ঞ টিমকে ডেপুটেশনে এনে অন্তত আইসিইউ এবং জরুরি বিভাগটি কাল থেকেই সচল করা।
৩. রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড: রাজশাহীর সকল আইসিইউ শয্যার অবস্থা জনগণের দেখার জন্য একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালু করা, যাতে নুসায়বাদের মতো কাউকে সিরিয়ালের মরীচিকার পেছনে দৌড়াতে না হয়।
৪. বিচারবিভাগীয় তদন্ত: কেন ২০২৩ সালে প্রস্তুত হওয়া ভবন ২০২৬ সালেও চালু হলো না এবং কার গাফিলতিতে ৩৩টি প্রাণ ঝরল, তার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
উপসংহার
রাজশাহী শিশু হাসপাতালের তালাবদ্ধ ফটকটি আজ আমাদের সামগ্রিক বিবেকের ওপর এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন। উন্নয়ন কেবল ইট-পাথরের স্থাপত্যে নয়, উন্নয়ন তখনই সার্থক হয় যখন সেই স্থাপত্যের ভেতরে একটি শিশু সুস্থভাবে শ্বাস নিতে পারে। ৩৩টি কফিন যেন নীতিনির্ধারকদের ঘুম ভাঙানোর জন্য যথেষ্ট হয়। তালা খুলুক হাসপাতালের, রক্ষা পাক উত্তরবঙ্গের আগামীর প্রাণগুলো। নুসায়বার বাবার সেই বিষণ্ণ কণ্ঠস্বর যেন আমাদের প্রশাসনিক অযোগ্যতার শেষ আর্তনাদ হয়।
লেখক:
মোঃ শামীউল আলীম শাওন
লেখক, উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী
সভাপতি, ইয়ুথ এ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ (ইয়্যাস)



















